উজ্জ্বল কুমার, জেলা প্রতিনিধি (নওগাঁ):
নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে নানা ও বাবার সম্পত্তির লোভে মামা-মামী এবং তাঁদের দুই সন্তানসহ একই পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে নিহত হাবিবুর রহমানের ভগ্নিপতি ও দুই ভাগনেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বুধবার (২৩ এপ্রিল) দুপুরে নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। এর আগে গত সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে বাহাদুরপুর গ্রামে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন:
বাহাদুরপুর গ্রামের নমির উদ্দিনের ছেলে হাবিবুর রহমান (৩৫), তাঁর স্ত্রী পপি সুলতানা (৩০), তাঁদের দুই সন্তান পারভেজ রহমান (৯) ও সাদিয়া আক্তার (৩)।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন:
নিহত হাবিবুরের বোন শিরিন আক্তারের স্বামী শহিদুল ইসলাম (৩০), তাঁর ছেলে শাহিন হোসেন এবং হাবিবুরের আরেক বোন হালিমা খাতুনের ছেলে সবুজ রানা (২০)। গ্রেপ্তারকৃত সবার বাড়ি একই গ্রামে।
হত্যাকাণ্ডের কারণ ও পরিকল্পনা:
পুলিশ সুপার জানান, মূলত পৈতৃক সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। হাবিবুরের বাবা তাঁর মোট ১৭ বিঘা সম্পত্তির মধ্যে বসতবাড়িসহ ১৩ বিঘা সম্পত্তি একমাত্র ছেলে হাবিবুরকে লিখে দেন। বাকি সম্পত্তি পাঁচ মেয়ের মধ্যে ভাগ করে দেন। ভাইকে বেশি সম্পত্তি দেওয়ায় বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগনেদের সঙ্গে হাবিবুরের দীর্ঘদিনের বিরোধ তৈরি হয়।
পুলিশ জানায়, পরিবারটিকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন (নির্বংশ) করতে পারলে ওই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়া যাবে—এমন পরিকল্পনা থেকেই খুনের নীল নকশা সাজানো হয়। গত সোমবার বিকেলে হাবিবুর তাঁর ভাগনে সবুজ রানাকে নিয়ে গরু কিনতে বাজারে যান। গরু কেনা না হলেও হাবিবুরের কাছে থাকা ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার দিকেও খুনিদের নজর ছিল।
যেভাবে চালানো হয় হত্যাকাণ্ড:
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সোমবার রাতে অভিযুক্তরা হাবিবুরের বাড়িতে গিয়ে একসাথে রাতের খাবার খান। পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়লে শাহিন বাড়ির মূল দরজা খুলে দেন। এরপর সবুজ ও শহিদুলসহ আরও ৫ জন বাড়িতে প্রবেশ করেন। প্রথমে হাবিবুরের বাবা নমির উদ্দিনের ঘরের শিকল বাইরে থেকে আটকে দেওয়া হয়। এরপর ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত হাবিবুরকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। পপি সুলতানা বাথরুমে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হলে তাঁকেও হাসুয়া দিয়ে আঘাত ও পরে গলা কেটে হত্যা করা হয়। সবশেষে সাক্ষ্য না রাখতে দুই শিশু সন্তানকেও নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করে ঘাতকরা।
পুলিশি অভিযান ও উদ্ধার:
ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার সকালে অভিযুক্তরা সাধারণ মানুষের মতোই নিহতের বাড়িতে উপস্থিত হন। তবে পুলিশের সন্দেহ হওয়ায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সবুজ রানা ও শহিদুলসহ কয়েকজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সবুজ ও শহিদুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যমতে, খড়ের পাল ও পুকুর থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হাসুয়া ও ছুরি উদ্ধার করা হয়।
নিয়ামতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান জানান, নিহত পপি সুলতানার বাবা বাদী হয়ে মঙ্গলবার রাতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তার তিনজনকে আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। ঘটনার সাথে জড়িত বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

