পান থেকে চুন খসলেই যেখানে সংসার ভাঙছে অহরহ, প্রতি মাসে যেখানে দম্পতিদের মধ্যে হাজার হাজার ডিভোর্সের ঘটনা ঘটছে এমনকি বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে করা গবেষণার তথ্যমতে, পুরুষের চেয়ে নারীর পক্ষ থেকে তালাক দেয়ার হার যখন অতিমাত্রায় বেড়ে গেছে, সে সময় শতবর্ষী দম্পত্তির এমন সুখের সংসার যেন সারা বিশ্বে বিরল দৃষ্টান্তের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
বলছিলাম, ১৮ বছর বয়সে নিজের চেয়ে ২ বছরের বড় ২০ বছর বয়সী স্ত্রী রহিমাকে বিয়ে করা ছয় ফুটের অধিক উচ্চতার মোঃ খয়বর আলী (আমির)-রহিমা বেগম দম্পতির কথা।
উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার নাগেশ্বরী পৌরসভার অন্তর্গত পূর্ব পয়রাডাঙ্গা গ্রামের মৃত মেসের আলীর পুত্র ৬ ফিটের অধিক উচ্চতার শতবর্ষী খয়বর আলীর জন্ম ১৩৩১ বঙ্গাব্দ, ১৯২৪ সালে পূর্বপয়রা ডাঙ্গা গ্রামে, বয়স ২-১ বছর বেশিও হতে পারে বলে স্মরণ করেন তিনি।
২ মেয়ে,৬ ছেলের জনক-জননী খয়বর-রহিমা দম্পতির চোখের সামনেই এখন তার চার বংশধর, ছেলে-মেয়ের ঘরে নাতি-নাতিন, তাদের ছেলে মেয়ে পুতি ও বংশ পরম্পরায় তাদেরও ছেলে মেয়ে হয়েছে যাদেরকে পুরুষানুক্রমে পুনরায় নাতি বলতে হচ্ছে। এক মেয়ে মারা গেছে বেশ আগেই। সবাই যার যার মতো নিজেদের সংসার কর্ম নিয়ে ব্যস্ত, আমরা দুজনে স্বামী-স্ত্রী থাকি একসঙ্গে, ভালো আছি আল্লাহ যথেষ্ট সুখে রেখেছেন।
এখনো এই শতবর্ষী বয়সী দম্পতির গল্প যেনো একালের ভালবাসায় ভরা সুখী দম্পতিদের সুখের সংসার, খুনসুটিতে ভরা আনন্দের গল্পকেও হার মানায়। স্ত্রী রহিমা বেগমের চেয়েও বয়সে দুই বছরের ছোট স্বামী খয়বর আলী হাট-বাজার করেন নিজেই, আর স্ত্রী স্বামীর জন্য পরম যত্নে করেন রান্না। কারো কোন সহযোগিতার প্রয়োজন হয়না তাদের, টিউবওয়েল চেপে পানি নেন, বাসার যাবতীয় কাজকর্ম এই শতবর্ষী দম্পতি নিজেরাই করেন। কোরআন হাদিস পড়েন খালি চোখেই, কথায় নেই কোন জড়তা, নেই কোন বয়সের ছাপ, মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন অনায়াসেই, নাম্বার সেভ করা, কল দেওয়া, কল রিসিভ করা কোনো কাজেই তাদেরকে কাউকে সাহায্য করতে হয়না। ২০১২ সালে হজ্ব পালন করেন।
পেশায় কৃষি কাজ করা খয়বর আলীকে নাগেশ্বরী উপজেলার হাশেম বাজারে সাইকেল চালাতে দেখে আশ্চর্য হয়ে দাদু সম্মোধন করে চা খাওয়াতে চাইলে তিনি হাসিমুখে নিজের চালানো সাইকেলটি দোকানের একপাশে রেখে বললেন, চলেন চা খাই তবে তোমরা নাতি, আমি খাওয়াবো । প্রখর শ্রবণশক্তি সম্পন্ন খয়বর আলীর স্মৃতিশক্তি এতই প্রবল যে, তার জীবনের পুরাতন সুখ ও দুঃখময় স্মৃতি গুলোর কথা জানতে চাইলে অনায়াসে বলে ফেলেন এক নিশ্বাসে, অল্প সময়ে যতদূর বলা যায়। দূর থেকে তাদের উদ্দেশ্যে ভেসে আসা কোন কথাও তারা অনায়াসে শুনে তার জবাব দিতে দেখা গেল, যেন ২৪-২৫ বছর বয়সী টগবগে দুটি মানুষ, একজোড়া ফুটন্ত গোলাপ ।
৪ প্রজন্ম চোখে দেখা এ দম্পতি বৃটিশ শাসনের শেষাংশ, ব্রিটিশ শাসনের অবসান, বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়, পাকিস্তান আমলের সব ঘটনাই বলতে পারেন। ২৫ বছর বয়সী যুবকের মত খালি চোখে দেখা এই দম্পতি চশমা ছাড়াই চলেন, খালি চোখেই পড়েন কোরআন,হাদিস, ফুটবল ও হাডুডু খেলায় পারদর্শী ছিলেন স্বামী খয়বর আলী, স্ত্রী রহিমা বেগম তার ২ বছরের বড় হলেও স্বামী হিসেবে তাকে করেন যথেষ্ট সম্মান, শ্রদ্ধা, দুজনেই বর্তমানে যৌবন বয়সী যেন এক নতুন সুখী দম্পতি, দু’জনেই রোযা করলেন।
জীবনে ভয়ঙ্কর কোনো অভিজ্ঞতার কথা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন কত গল্প বলবো, অনেক গল্প আছে আল্লাহর দেওয়া এই লম্বা জীবনে, তবে একটা ছোট্ট গল্পের কথা বলি, “যৌবন বয়সে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার কর্ত্তিমারী হাঁটে গেছি মহিষ কিনতে, নৌকায় নদী পার করে আনি । তখন বেশ রাত হয়েছিল, আনতে ডাকাতির কবলে পড়ি, কৌশলে সহযোগীকে বলি, মহিষ দুটো ডাকাতদের দিয়ে দিতে, আরো বলি, মহিষ দুটো ডাকাতদের দিয়ে দাও, ডাকাতরাই আমার বাড়িতে কালকে মহিষ জোড়া দিয়ে আসবে, এটা শোনার পর ডাকাতেরা মহিষ ছেড়ে পালিয়ে যায়, পরে সেই মহিষ নিয়ে বাড়িতে আসি।”
শতবর্ষী হলেও চিরযৌবনা এই মানুষটির সাথে চা খেতে খেতে কথা শেষ হলে, তিনি বলেন আমার তাবলীগ জামাতের এক প্রোগ্রাম আছে যেতে হবে, এরপর আবারও তার সাইকেলটি নিয়ে তাবলীগের কাজ করতে বেরিয়ে যান।

