রতন মালাকার, সাপাহার (নওগাঁ) প্রতিনিধি:
সংসারে উপার্জনক্ষম কেউ নেই। স্বামী থেকেও যেন নেই। ছেলে-সন্তানও নেই। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। এর মধ্যে এক মেয়ে স্বামীর সংসার ছেড়ে দুই সন্তানকে নিয়ে ফিরে এসেছেন মায়ের কাছে। এখন নিজের সঙ্গে মেয়ের দুই সন্তান ও মেয়েকে নিয়ে চার সদস্যের সংসারের একমাত্র ভরসা ৫০ বছর বয়সী লাইলী বেগম।
বাড়ির উঠানের সামান্য জায়গায় শাকসবজি চাষ করেন তিনি। সেই সবজি বাজারে বিক্রি করে যে সামান্য টাকা পান, তা দিয়েই চলে চারজনের খাবার, চিকিৎসা ও নিত্যদিনের খরচ। কোনো দিন বিক্রি হয় সবগুলো, কোনো দিন অবিক্রিতই থেকে যায় কিছু সবজি। তবু থেমে থাকার সুযোগ নেই লাইলীর। কারণ তাঁর থেমে যাওয়া মানেই থেমে যাবে পুরো সংসার।
নওগাঁর সাপাহার উপজেলার গাঞ্জাকুড়ি গ্রামের লাইলী বেগমের জীবন এখন এমনই এক কঠিন বাস্তবতার নাম।
গত বুধবার বিকেলে সাপাহার উপজেলা সদরের কাঁচাবাজারে অল্প কিছু কচুর মোচা নিয়ে বসেছিলেন লাইলী। বাজারে সবজি বিক্রির জন্য তাঁর কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নেই। কখনো দোকানের সামনে ফুটপাতে, কখনো কোনো দোকানের এক কোণে, আবার কখনো মানুষের চলাচলের পাশেই বসতে হয় তাঁকে।
বাজারের কোলাহলের মধ্যেই নিজের সবজির দিকে তাকিয়ে বসে থাকেন তিনি। কখনো ক্রেতা আসে, কখনো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু তাঁর চোখে-মুখে শুধু দারিদ্র্যের ছাপ নয়, পরিবারের জন্য বেঁচে থাকার এক অদম্য চেষ্টা।
লাইলী বেগম বলেন, “আমার সংসারে আয় করার মতো কেউ নেই। বাড়ির উঠানে অল্প জায়গায় শাকসবজি চাষ করি। সেগুলো বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাই। কিন্তু বাজারে এসেও বসার জায়গা পাই না। এভাবে আর কতদিন চলতে পারব জানি না।” কথা বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
লাইলীর কষ্ট এখানেই শেষ নয়। বন বিভাগের সঙ্গে চলমান একাধিক মামলার খরচও বহন করতে হচ্ছে তাঁকে। একদিকে সংসারের চারজন মানুষের খাবারের চিন্তা, অন্যদিকে মামলার ব্যয়—সব মিলিয়ে প্রতিটি দিনই তাঁর কাছে নতুন এক সংগ্রাম।
লাইলী বেগম আরও বলেন, “সরকারি বা কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সহযোগিতা পাইনি। যদি আমাকে একটা ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা করে দেওয়া হতো, তাহলে সংসারটা একটু ভালোভাবে চালাতে পারতাম।”
স্থানীয়রা বলছেন, লাইলী বেগমকে শুধু এককালীন আর্থিক সহায়তা দিলেই তাঁর সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাঁর বাড়ির উঠানে সবজি উৎপাদনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সবজি চাষ সম্প্রসারণ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, নারীদের স্বাবলম্বী প্রকল্প কিংবা অন্য কোনো উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে তিনি নিজেই পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারবেন।
তাদের দাবি, সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় লাইলী বেগমের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি তাঁকে স্থায়ীভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেওয়া হোক।
লাইলী বেগমের হাতে হয়তো বড় কোনো পুঁজি নেই, নেই দোকান বা জমিজমার বড় মালিকানা। আছে শুধু পরিশ্রম করার ইচ্ছা। উঠানের সামান্য মাটিতে ফলানো সবজিই তাঁর জীবনের অবলম্বন।
তাই লাইলীর চাওয়া খুব বেশি নয়—একটি ফ্যামিলি কার্ড, একটু সহায়তা আর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ। সেই সুযোগটি যদি কেউ করে দিতে পারেন, তাহলে হয়তো কাঁচাবাজারের এক কোণে বসে থাকা এই নারীই একদিন হয়ে উঠবেন নিজের পরিবারের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
সাপাহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রোমানা রিয়াজ বলেন, লাইলী বেগমের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।

