**চাঁদপুর প্রতিনিধি।।**
চাঁদপুর সদর উপজেলার বহরিয়া বাজারে ঋণ ও আর্থিক সংকটের চাপে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে বলাই সূত্রধর (৩৫) নামে এক জুয়েলারি ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের দাবি, ধারদেনা ও ঋণের বোঝা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুশ্চিন্তায় ছিলেন তিনি। পুলিশ জানিয়েছে, গত ১ নভেম্বর নিজ দোকানে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ পান করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বলাই সূত্রধরের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন চাঁদপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফয়েজ আহমেদ।
নিহত বলাই সূত্রধর চাঁদপুর সদর উপজেলার ১০ নম্বর লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বহরিয়া বাজার এলাকার বাসিন্দা। তিনি বাজারের সিআইপি বেড়িবাঁধসংলগ্ন ‘মায়া শিল্পালয়’ নামে একটি স্বর্ণের দোকানে জুয়েলারি ব্যবসা পরিচালনা করতেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১ নভেম্বর রোববার বিকেলে নিজ দোকানে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ পান করেন বলাই। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তাঁকে উদ্ধার করে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে কুমিল্লা অতিক্রমকালে পথেই তাঁর মৃত্যু হয়।
বহরিয়া বাজারের ফল ব্যবসায়ী আল-আমিন জানান, বলাই দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট ও ঋণের চাপে হতাশায় ভুগছিলেন। তাঁর এমন পরিণতিতে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বলাইয়ের আর্থিক অবস্থা আগে থেকেই ভালো ছিল না। ব্যবসায়িক দেনা-পাওনা ও ঋণের চাপের মধ্যেই তিনি প্রথমবার জাঁকজমকপূর্ণভাবে বিয়ে করেন। ওই বিয়েতে বড় আয়োজন, প্যান্ডেল ও অতিথি আপ্যায়নে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। পরবর্তীতে তাঁর প্রথম স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় স্ট্রোক করে মারা যান বলে জানা গেছে।
প্রথম বিয়ের দেনা পরিশোধের আগেই প্রায় ছয় মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন বলাই। দ্বিতীয় বিয়েতেও আগের চেয়ে বড় আয়োজন করা হয় বলে স্থানীয়রা জানান। পরবর্তীতে জমি কেনা ও বাড়ি নির্মাণের কারণে তাঁর আর্থিক দায় আরও বেড়ে যায়। এভাবে ধারদেনা ও ঋণের বোঝা ক্রমেই বাড়তে থাকে।
দ্বিতীয় স্ত্রী বৃষ্টি রানী সূত্রধরের ঘরে অঙ্কুর সূত্রধর নামে সাড়ে তিন বছর বয়সী একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। বর্তমানে তাঁর স্ত্রী ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
স্বামীর মৃত্যুর পর দুই সন্তান নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বৃষ্টি রানী সূত্রধর। তিনি বলেন, “এই চৌচালা বাড়িটুকু ছাড়া বলাই আমাদের জন্য আর কিছুই রেখে যেতে পারেনি। এখন আমার ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। যে মানুষটি ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চলে গেল, সে আমাকে কিছুই বলে যেতে পারেনি। সকল পাওনাদারের কাছে অনুরোধ, মানবিক দিক বিবেচনা করে তাঁকে ক্ষমা করে দেবেন। আমার সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আপনারা সাধ্যমতো পাশে দাঁড়াবেন—এটাই আমার প্রত্যাশা।”
চাঁদপুর সদর মডেল থানার ওসি ফয়েজ আহমেদ জানান, ময়নাতদন্ত শেষে বলাই সূত্রধরের মরদেহ সৎকারের জন্য পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঋণের চাপ ও হতাশা থেকে তিনি বিষাক্ত পদার্থ পান করেছিলেন বলে জানা গেছে।
একজন মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি পরিবারের উপার্জনের অবলম্বন হারিয়ে গেছে। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও ছোট সন্তানের ভবিষ্যৎ এখন বড় অনিশ্চয়তার মুখে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবান ও সংশ্লিষ্ট সবার মানবিক সহযোগিতা কামনা করছেন স্বজনরা।

