মণিপুর এখন কেমন আছে?
একশ বছেররও বেশি আগের কথা। জাপান আর যুক্তরাষ্ট্রের শ্রোতাদের সামনে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি সতর্ক বার্তা দিয়েছিলেন জাতিরাষ্ট্র বা নেশন-স্টেট নিয়ে। ১৯১৭ সালে দেওয়া তাঁর সেই বক্তৃতাগুলো পরে বই আকারে বেরোয়, নাম ‘ন্যাশনালিজম’। ঠাকুরের ভাষায়, জাতিরাষ্ট্র আসলে একধরনের যন্ত্র। মানুষকে সেখানে সংগঠিত করা হয় লাভ আর ক্ষমতার হিসাবে, সম্পর্কের হিসাবে নয়। তাঁর ভয় ছিল, এই যন্ত্র একদিন মানুষের সব বৈচিত্র্য পিষে ফেলবে। বাংলা ভাগ হতে দেখেছিলেন তিনি নিজের চোখে, ১৯০৫ সালে, ধর্মের ভিত্তিতে। সেখান থেকেই তাঁর উপলব্ধি হয়েছিল, দক্ষিণ এশিয়ার মতো বহু ভাষা, বহু ধর্ম, পাহাড়-সমতলে ভরা এক উপমহাদেশে ইউরোপ থেকে ধার করা কঠোর জাতিরাষ্ট্রের ছাঁচ কখনোই মানানসই হবে না।
মণিপুরের দিকে তাকালে ঠাকুরের এই আশঙ্কা যেন হাতেনাতে প্রমাণ হয়ে যায়। ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের এই ছোট্ট, অপূর্ব সুন্দর রাজ্য গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে একই দৃশ্য বারবার ফিরে আসছে। একটি বহুত্ববাদী সমাজকে জোর করে একটিমাত্র ছাঁচে ফেলার চেষ্টা, আর তাতে একটি সম্প্রদায়ের দাবিকে অন্যটির ওপর বসিয়ে দেওয়া। রাষ্ট্র এখানে শাসনের নামে যা করছে, তার দাম দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, রক্ত দিয়ে, ঘরবাড়ি দিয়ে।
উপত্যকা আর পাহাড়ের পুরোনো ভাগাভাগি মণিপুর কোনো নতুন রাজ্য নয়। শত শত বছর ধরে এখানে নিজস্ব রাজতন্ত্র ছিল, নিজস্ব লিপি ছিল, ছিল বৈষ্ণব সংস্কৃতি। কেন্দ্রে ছিল ইম্ফল উপত্যকা, যেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মেইতেই সম্প্রদায়ের। চারপাশের পাহাড়ে বাস করে নাগা আর কুকি-জো আদিবাসীরা। তাদের সমাজ চলে গোষ্ঠীর নিয়মে, উপত্যকার জাতপাত-নির্ভর হিন্দুসমাজ থেকে যা সম্পূর্ণ আলাদা।
ব্রিটিশ আমলে এই ভাগাভাগি অক্ষতই থেকে যায়, বরং আইনের মোড়কে আরও পোক্ত হয়। পাহাড়ে জমি কেনায় বাধা পড়ে উপত্যকার মানুষের ওপর। বদলে আদিবাসীরা পায় তফসিলি উপজাতির মর্যাদা, সঙ্গে সংরক্ষিত চাকরি, শিক্ষা আর রাজনৈতিক আসন। ১৯৪৯ সালে মণিপুর ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়। যদিও অনেক মণিপুরি ইতিহাসবিদ আজও বলেন, এই যুক্তি ছিল চাপে পড়া, স্বতঃস্ফূর্ত নয়। রাজ্যের পূর্ণ মর্যাদা মেলে আরও পরে, ১৯৭২ সালে।
এই বন্দোবস্ত আসলে কোনো সমাধান ছিল না। ছিল শুধু একটা সাময়িক সমঝোতা, যা একদিন না একদিন ভাঙতই।
যেভাবে ভাঙল সমঝোতা, সেই ভাঙন এল ২০২৩ সালের মে মাসে। মেইতেইরা বহুদিন ধরেই নিজেদের জন্য তফসিলি উপজাতি মর্যাদা চাইছিল। যুক্তি সহজ, এই মর্যাদা পেলে তারাও পাহাড়ে জমি কিনে বসতি গড়তে পারবে। কিন্তু কুকি-জো আর নাগাদের কাছে এই দাবি শোনাল অস্তিত্বের সংকট হিসেবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের স্বায়ত্তশাসন যে জমি-সুরক্ষা আইনের ওপর দাঁড়িয়ে, মেইতেইদের এই দাবি সরাসরি তাতেই আঘাত হানল।
মণিপুর হাইকোর্ট যখন মেইতেইদের দাবির পক্ষে ইঙ্গিত দিল, তখনই বিস্ফোরণ ঘটল। মে মাসের গোড়ায় ডাকা একটি ‘ট্রাইবাল সলিডারিটি মার্চ’ মুহূর্তে সহিংস হয়ে উঠল। তারপর থেকে রাজ্যটি আর সত্যিকারের শান্তি দেখেনি।
হিসাব বলছে, আড়াই শতাধিক মানুষ এই সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন। ঘরছাড়া হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। শত শত গির্জা, শতাধিক মন্দির পুড়েছে বা ভাঙচুর হয়েছে। থানা-অস্ত্রাগার লুট হয়ে অস্ত্র চলে গেছে সাধারণ মানুষের হাতে। বাংকার বসেছে, তৈরি হয়েছে মিলিশিয়া। রাজ্যের একটা অংশ কার্যত পরিণত হয়েছে ছোট এক গৃহযুদ্ধে। উপত্যকা আর পাহাড়কে আলাদা করে দিয়েছে এমন এক সীমারেখা, রাষ্ট্র নিজেই যা আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
রাজনীতির অচলাবস্থার দুই বছর
এই বিভাজন সারাতে পরের বছরগুলো তেমন কিছুই করেনি। বরং তাকে আরও পোক্ত করেছে। মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংয়ের মেইতেই-ঘেঁষা রাজনীতিকে দায়ী করা হয় এই আগুনে ঘি ঢালার জন্য। বারবার পদত্যাগের দাবি উঠলেও তিনি ক্ষমতা আঁকড়ে ছিলেন। শেষে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
তাঁর দল বিজেপি নতুন মুখ্যমন্ত্রী ঠিক করতে পারেনি। ফলে দিল্লি রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে। মণিপুরের ইতিহাসে এ নিয়ে একাদশতম বার, ভারতের যেকোনো রাজ্যের মধ্যে যা সর্বোচ্চ রেকর্ড।
প্রায় এক বছর ধরে নির্বাচিত বিধানসভা পড়ে ছিল স্থগিত হয়ে। প্রশাসন চলে গিয়েছিল রাজ্যপাল আর নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে। ২০২৫ সালজুড়ে দুই দফা বাড়ানো হয় সেই শাসনের মেয়াদ, যদিও সমঝোতার আলোচনায় তেমন অগ্রগতি হয়নি।
মণিপুর এখন কেমন আছে
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রপতি শাসনের অবসান ঘটে। ইউমনাম খেমচাঁদ সিং মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। নামমাত্র হলেও একটা নির্বাচিত সরকার ফিরে আসে রাজ্যে। কিন্তু স্বাভাবিকতা এখনো শুধু সরকারি বিবৃতিতেই আটকে আছে, মাটিতে তার দেখা নেই।
এপ্রিলে বিষ্ণুপুর জেলায় বোমা হামলায় প্রাণ হারায় দুই শিশু। ফের একে অপরকে দুষলু দুই সম্প্রদায়। প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ল রাস্তায়। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ গেল আরও কয়েকজন বিক্ষোভকারীর। উপত্যকার জেলাগুলোয় আবার ফিরে এল কারফিউ, বন্ধ হয়ে গেল ইন্টারনেট।
স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের হিসাবে, প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কোথাও না কোথাও সংঘর্ষ হচ্ছে এখনো। শুধু ২০২৬ সালের প্রথমার্ধেই মারা গেছেন কয়েক ডজন মানুষ। সরকারি কর্তারা অবশ্য বলছেন, ২০২৩-২৪ সালের তুলনায় সংখ্যাটা কমছে। কিন্তু ৫৮ হাজারের বেশি মানুষ আজও ত্রাণশিবিরে দিন গুনছেন। তাঁদের গ্রামগুলো হয় বিপজ্জনক, নয়তো প্রতিপক্ষের দখলে, ফেরার পথ নেই। সংঘাতের শুরুতে লুট হওয়া অস্ত্র এখনো হাতে হাতে ঘুরছে। মিয়ানমারের অস্থির সীমান্ত দিয়ে আসছে নতুন অস্ত্রের চালান। দুই পক্ষই তাই সশস্ত্র থেকে যাচ্ছে এমন এক লড়াইয়ের জন্য, থামানোর উপায় যার রাজ্য বা কেন্দ্র, কারও হাতেই এখনো নেই।
বাংলাদেশের সঙ্গে যোগসূত্র
দিল্লির রাজনীতির কোলাহলে মণিপুরের কান্না হয়তো চাপা পড়ে যায়। কিন্তু সীমান্তের ওপারে এর ঢেউ কম নয়। এই বিভাজনরেখা আসলে কোনো সীমান্তই মানে না। মণিপুরের পাহাড়ে লড়াইরত কুকি-জোরা সেই একই বৃহৎ কুকি-চিন পরিবারের অংশ, যাদের বসবাস মিজোরাম, মিয়ানমারের চিন রাজ্য আর বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়েও।
বান্দরবানে নিজস্ব কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট আর তার সশস্ত্র শাখার উত্থান ঢাকাও দেখেছে। এই সংগঠন দাঁড়িয়ে আছে সেই একই সীমান্ত-পারাপার আত্মীয়তা আর ক্ষোভের ওপর, যা মণিপুরের আগুনকেও জিইয়ে রেখেছে। ইতিমধ্যে অতর্কিত হামলায় প্রাণ গেছে বাংলাদেশি সেনাসদস্যদেরও। বিশ্লেষকেরা তাই এখন মণিপুর থেকে মিজোরাম, মিয়ানমারের চিন রাজ্য হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত পুরো বলয়টাকে দেখছেন অস্থির সীমান্তভূমি হিসেবে। এক দেশের হতাশা এখানে দ্রুতই প্রতিধ্বনিত হয় পাশের দেশে, কখনো কখনো অস্ত্র আর যোদ্ধা নিয়েই।
শিক্ষা যেখানে
ইম্ফল হোক, বেলুচিস্তান হোক বা পার্বত্য চট্টগ্রাম, বহুত্ববাদী আর ঐতিহাসিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত জনগোষ্ঠীদের জোর করে সংখ্যাগুরুর জাতীয়তাবাদী ছাঁচে ফেলার চেষ্টা কখনো ঐক্য গড়ে না। বরং জন্ম দেয় ঠিক সেই দীর্ঘস্থায়ী, নিষ্পেষণকারী সহিংসতা, যা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একশ বছর আগেই সাবধান করেছিলেন। দক্ষিণ এশিয়া যদি আরও মণিপুর এড়াতে চায়, তাহলে তাকে এখনই খুঁজে বের করতে হবে সেই রাজনৈতিক কল্পনাশক্তি, জাতির যান্ত্রিক অভিজ্ঞতার আগে সম্পর্ক আর স্বায়ত্তশাসনকে সম্মান জানানোর সাহস।
মোঃ নাবিল খান
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

