মোঃ জাকের হোসেন, হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি:
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে ঘটা করে নিজের জন্মদিন পালন করেছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. আবদুর জব্বার। অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের কাছ থেকে উপহার সামগ্রী (উপঢৌকন) গ্রহণ ও সরকারি অফিসে এমন আয়োজনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর প্রশাসনিক শিষ্টাচার এবং সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা বিধি নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর বুধবার দুপুরে হাতিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে প্রায় শতাধিক শিক্ষককে সাথে নিয়ে এই জন্মদিনের অনুষ্ঠান উদযাপিত হয়। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায়, কার্যালয়ে থাকা কর্মচারী ও বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুর জব্বারকে কেক খাইয়ে দিচ্ছেন এবং মোমবাতি জ্বালিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। এছাড়া দলবদ্ধ হয়ে শিক্ষকেরা তার হাতে উপহারের প্যাকেট তুলে দিচ্ছেন। এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর তিনি নিজের ফেসবুকে ‘জন্মদিনের শুভ লগ্নে শুভাকাঙ্ক্ষীদের মনে পড়ে…’ শীর্ষক একটি কবিতা পোস্ট করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ফেসবুকে শিক্ষা কর্মকর্তার কবিতার স্ট্যাটাস দেওয়ার মূল উদ্দেশ্যই ছিল শিক্ষকদের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেওয়া। পরবর্তীতে বাধ্য হয়েই শিক্ষকেরা চাঁদা তুলে জন্মদিন পালনের আয়োজন করেন এবং কর্মকর্তা ও তার পরিবারের জন্য পোশাকসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী কিনে উপহার দেন।
শিক্ষকদের অভিযোগ, শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুর জব্বার ও উচ্চমান সহকারী নাজিম উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি চালিয়ে আসছেন। ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে তাকে বদলির আদেশ দেওয়া হলেও, এক সপ্তাহের মাথায় ২৫ নভেম্বর তা বাতিল করিয়ে স্বপদে বহাল থাকেন। তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষক বদলি ও ডেপুটেশন বাণিজ্য, বিদ্যালয় পরিদর্শনে অনিয়ম, ঘুষের বিনিময়ে অনুপস্থিত শিক্ষকের বেতন ছাড়, স্মারক জালিয়াতি, ভুয়া ভাউচারে অর্থ আত্মসাৎ ও তদন্ত প্রতিবেদন পরিবর্তনের মতো অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষক ও প্রাক্তন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তারা। এসব সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের আরও দাবি, বিভাগীয় উপপরিচালক নুরুল ইসলাম, অধিদপ্তরের তদন্ত ও শৃঙ্খলা শাখার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আজমীরা খাতুন এবং নোয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইসরাত নাসিমা হাবীবের সাথে সখ্যতার দাপট দেখিয়ে তিনি পার পেয়ে যান।
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক নূরুল ইসলাম ব্যস্ততা দেখিয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানান। অন্যদিকে আজমীরা খাতুন বিষয়টিকে ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, “আবদুর জব্বারকে আমি চিনি না। আমাদের নিয়ম অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করা হয় এবং এমন বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো উচিত।” নোয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইসরাত নাসিমা হাবীবের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অধ্যাপক তোফায়েল হোসেন ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি আ.ন.ম হাসান জানান, ক্লাস চলাকালে শিক্ষকদের ডেকে এনে সরকারি দপ্তরে ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান পালন সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা এবং শিষ্টাচার ও নৈতিকতা বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি শিক্ষকদের মধ্যে অনিয়মের প্রবণতা বাড়াবে এবং তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাতিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুর জব্বার বলেন, “বিষয়টি খুবই ছোটখাটো। শিক্ষকদের ভালো লেগেছে, তাই তারা আমার জন্মদিনের আয়োজন করেছিলেন।”

