ওটিটির যুগেও সিনেমা হলে দর্শকের হিড়িক: বড় পর্দার জাদু কি এখনো অটুট?
ওটিটি পরবর্তী যুগে ধারণা করা হতো যে, ওটিটি (Over-the-Top) প্ল্যাটফর্মের উত্থানে সিনেমা হলের দিন ফুরিয়ে আসছে। কেননা আজকাল দর্শক ঘরে বসেই যখন পছন্দের সিনেমা ও সিরিজ দেখতে ও উপভোগ করতে পারছেন, তাই আর কেন কেউ সময় ও অর্থ ব্যয় করে সিনেমা হলে যাবেন? এই ভাবনা থেকে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। কিন্তু বাস্তবতা আসলে বলছে ভিন্ন কথা। কেননা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র মুক্তির সময় সিনেমা হলগুলোতে দর্শকের উল্লেখযোগ্য ভিড় দেখা গেছে। ফলে স্বভাবতই একটি প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে যে, ওটিটির যুগেও কি বড় পর্দার আকর্ষণ অটুট রয়েছে?
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আজকাল মানুষের বিনোদন গ্রহণের ধরণ পুরোপুরিভাবে বদলে দিয়েছে প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে। স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় যেকোনো সময় সিনেমা দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তাই কারণবশতই এই সময়ে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, সিনেমা হল হয়তো ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাবে। (তথ্যসূত্র: দি ডেইলি স্টার)
ওটিটি আর সিনেমা হলের পার্থক্য তৈরি হয় মূলত বড় পর্দা, উন্নত শব্দব্যবস্থা এবং একসঙ্গে শত শত মানুষের সঙ্গে সিনেমা উপভোগ করার অনুভূতি, যা ঘরে বসে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের মতে, এটি একটি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা, শুধুমাত্র চলচ্চিত্র দেখার স্থান ছাড়াও। এ কারণেই মানসম্মত ও আলোচিত চলচ্চিত্র মুক্তি পেলে এখনো দর্শক সিনেমা হলে ছুটে আসেন। (তথ্যসূত্র: প্রথম আলো)
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওটিটি এবং সিনেমা হলকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে পরিপূরক মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত। কেননা ওটিটি দর্শকদের জন্য সহজলভ্যতা নিশ্চিত করলেও সিনেমা হল একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা প্রদান করে, যা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখনো পুরোপুরিভাবে প্রতিস্থাপন করতে পারেনি। (তথ্যসূত্র: ডেইলি টাইমস অফ বাংলাদেশ)
অন্যদিকে, যদিও দেশের অনেক পুরোনো একক পর্দার সিনেমা হল দর্শকসংখ্যা কমে যাওয়া, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল বিনোদনের প্রসারের কারণে এখনো সংকটের মুখে রয়েছে। এমনকি অনেক হল বন্ধ হয়ে গেছে বা অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবুও মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতির বিস্তার এবং মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণের কারণে নতুন প্রজন্মের দর্শক আবারও প্রেক্ষাগৃহমুখী হচ্ছে। (তথ্যসূত্র: নিউ এজ)
এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেক দর্শক মত প্রকাশ করে থাকেন যে, ভালো সিনেমা হলে দেখার অভিজ্ঞতা ওটিটিতে পাওয়া যায় না। হলের সাউন্ড কোয়ালিটি, 3D, 4D স্ক্রিনিংয়ের ভার্চুয়াল রিয়েলিস্টিক অভিজ্ঞতা উপভোগ করার সুযোগ থাকায় দর্শকদের আগ্রহ এবং হলমুখী হওয়ার প্রবণতা এখনো বড় পর্দার প্রতি মানুষের আবেগেরই প্রমাণ। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের বিনোদন জগতে ওটিটি ও সিনেমা হল উভয় মাধ্যমই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ওটিটি যেমন দর্শকের হাতের মুঠোয় বিনোদন পৌঁছে দিচ্ছে, তেমনি সিনেমা হল এখনো বিশেষ আয়োজন, উৎসব এবং সম্মিলিত অভিজ্ঞতার কেন্দ্র হয়ে রয়েছে। তাই বলা যায়, ওটিটির ব্যাপক প্রসার সত্ত্বেও সিনেমা হলের প্রতি দর্শকের আকর্ষণ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বরং ভালো গল্প, উন্নত নির্মাণ এবং অনন্য অভিজ্ঞতা দিতে পারলে বড় পর্দার জাদু আগামী দিনেও দর্শকদের টেনে আনবে।
লেখক – সামিয়া আক্তার মুন
ডিপার্টমেন্ট অব টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

