উজ্জ্বল কুমার সরকার নওগাঁঃ
সৌদি আরবের রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ দেশে ফিরছে শনিবার। প্রায় আড়াই মাসের অপেক্ষার অবসান ঘটলেও স্বজনদের জীবনে কাটছে না অনিশ্চয়তা।
প্রিয়জনকে হারানোর শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঋণের বোঝা, বন্ধক রাখা ভিটে মাটি আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় যাঁরা বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন, তাঁদের মৃত্যুর পর ঋণ পরিশোধের দায় এসে পড়েছে স্বজনদের ওপর।
বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত হওয়া পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৩৬ ফ্লাইটে শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ৮টা ৫ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
মরদেহ দেশে ফিরতে যাওয়া পাঁচ প্রবাসী হলেন নওগাঁ পৌর এলাকার পার নওগাঁর শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের সাগর আলী। ছয় মাসেই শেষ স্বপ্ন, ঋণ সাড়ে ছয় লাখ টাকা
আত্রাই উপজেলার সাধনগর গ্রামের সাগর আলীর মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে তাঁর পরিবার। সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় মাত্র ছয় মাস আগে সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন পারভীন খাতুন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান সাগর।
পারভীন খাতুন জানান, তাঁদের একমাত্র সম্বল ভিটাবাড়িটিও মহাজনের কাছে বন্ধক রাখা। এর মধ্যে ঋণের এক লাখ টাকাও পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি।
স্বামীকে হারিয়ে এখন দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি তিনি। একদিকে সন্তানদের লালন-পালন, অন্যদিকে পাওনাদারদের তাগাদা—সব মিলিয়ে দিশাহারা এই গৃহবধূ।
বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধের আগেই উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি এখন কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, সেই প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
ছেলের মুখ দেখতে অপেক্ষায় বৃদ্ধ বাবা-মা নিহত মাসিদুল সরদারের মরদেহের অপেক্ষায় ছিলেন আত্রাইয়ের সত্তরোর্ধ্ব মজনু সরদার ও তাঁর স্ত্রী ছাইদা বেগম। ছেলের খোঁজ পেতে তাঁরা নিয়মিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যেতেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মজনু সরদার লাঠিতে ভর দিয়ে ছুটে যেতেন প্রশাসনের দপ্তরে।
তাঁর আকুতি ছিল, মৃত্যুর আগে অন্তত ছেলের মুখটি শেষবারের মতো দেখতে চান। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেই সুযোগ আসছে। তবে ছেলের মরদেহ ফেরার এই মুহূর্তে পরিবারের সদস্যদের মনে স্বস্তির পাশাপাশি শোকও আরও গভীর হচ্ছে।
অন্যদিকে, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের পারুল আক্তারের জীবনেও নেমে এসেছে গভীর শূন্যতা। ফোনে ছেলে মিনহাজের ছবি দেখে কাঁদছেন তিনি। যে ছেলেকে ঘিরে ছিল পরিবারের স্বপ্ন, তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষা শেষ হচ্ছে নিথর দেহ ফেরার মধ্য দিয়ে।
আড়াই মাস পর ফিরছে মরদেহ
গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে নওগাঁ জেলার ছিলেন ১২ জন। গত ২৭ আগস্ট প্রথম দফায় সাতজনের মরদেহ দেশে আনা হয়। পরিচয় শনাক্তকরণ ও আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতায় বাকি পাঁচজনের মরদেহ সৌদি আরবের হিমঘরে ছিল।
স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষার পর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হওয়ায় মরদেহগুলো দেশে আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার মরদেহগুলো দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
সরকারি সহায়তা কতটা স্বস্তি দেবে?
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান জানান, আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের সমন্বয়ে মরদেহগুলো দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তবে পরিবারগুলোর তাৎক্ষণিক প্রয়োজন শুধু মরদেহ গ্রহণ কিংবা দাফন সম্পন্ন করা নয়। ঋণ পরিশোধ, সন্তানদের ভরণপোষণ এবং জীবিকার সংস্থানও তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে যেসব পরিবার বসতভিটা বন্ধক রেখে ঋণ করেছে, তাদের জন্য আর্থিক সহায়তা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে সহায়তার পরিমাণ ও সময়মতো তা পাওয়ার ওপর।
প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফিরছে, শেষবারের মতো দেখার অপেক্ষাও শেষ হচ্ছে। কিন্তু যাঁদের উপার্জনে চলত সংসার, তাঁদের অনুপস্থিতিতে পরিবারগুলো কীভাবে নতুন করে জীবন শুরু করবে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।

