সিরাজুল ইসলাম কমল নগর লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি
ভূমিহীন পরিবারের মেধাবী সন্তান ইসমাঈল হোসেন সোহাগ। নিরক্ষর ভূমিহীন বাবা শাহে আলম একসময় ছিলেন শ্রমিক। অসুস্থতার কারণে এখন বেকার। অভাবি পরিবারের ছেলে সোহাগ পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। টিউশনির টাকায় চলে নিজের পড়াশোনাে আর সংসার।
কিন্ত বর্তমানে এক মানবেতর জীবনযাপন করছে সোহাগদের পরিবার। তাই সোহাগের দিনের বেশি ভাগ সময় কাটে পরিবারের দুঃচিন্তায়। কারণ প্রভাবশালী প্রতিবেশি আবুল কালাম ও তার পরিবারের ৮ সদস্য ভূয়া ভূমিহীন সেজে বন্দোবস্ত নিয়েছে সোহাগদের বসতবাড়ির সব জমি । বন্ধ করে দিয়েছে চলাচলের পথ এবং বিশুদ্ধ পানি পানের ব্যবস্থা। ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ে পড়ুয়া সোহাগদের বাড়িতে এখন কেউ আসতে পারে না এবং বাড়ি থেকে যেতেও পারে না । কার্যত তারা এখন খোলা কারাগারের বাসিন্দা।
ভূমিহীন শাহে আলম লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার উত্তর চর লরেঞ্চ মদিনাতুল উলুম মাদরাসা সংলগ্ন ২ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা। প্রতিপক্ষ মরহুম আবুল কালামের পরিবার একই এলাকার বাসিন্দা।
কমলনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় থেকে জানা গেছে, ভূমিহীন শাহ আলমের বসতভিটা থাকা জমি যার নামে বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে তা বাতিল করে ভূমিহীন ওই পরিবারে বন্দোবস্ত দেয়ার জন্য লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসকের নিকট প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে । এর আগে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের তহশিলদার, উপজেলা সার্ভেয়ার এবং উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা সরেজমিন তদন্ত করে ভূক্তভোগী পরিবারের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন।
শাহে আলম (৬০) এবং তার বাবা আলী আহম্মদ পাটোয়ারী (৭৫) অভিযোগ করে জানান,অ্যাসিল্যান্ডের প্রতিবেদনের পরে তাদের দরিদ্র পরিবারের ওপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন আর মিথ্যা মামলার,
মোঃ শাহে আলম জানান, তাদের ১০ সদস্যের যৌথ পরিবারটি কৃষি শ্রমজীবি এবং অত্যন্ত দরিদ্র। বর্তমান বসতবাড়ি ছাড়া তাদের আর কোন জমিজমা নেই। কিন্ত প্রতিবেশী মৃত আবু আবুল কালাম ওরফে আবু মিয়ার প্রতারণায় তারা এখন নিঃস্ব। প্রচুর জমির মালিক ছিলেন আবুল কালাম ও তার পরিবারের সদস্যরা । তবুও প্রতারণা করে নিজ পরিবারের সদস্যদের ভূমিহীন সাজিয়ে এবং একই বাড়ির সদস্য পরিচয় দিয়ে শাহে আলমের বসত ভিটার ৬৯ শতক জমিসহ একশ ৯৫ শতক খাস জমি বন্দোবস্ত নিয়েছেন।
যার মধ্যে আবুল কালাম নিজে এবং তার স্ত্রী শাহিননুর বেগম, মেয়ে কামরুন নাহার মুন্নী, জামাই আবুল বাশার, মেয়ে সামছুন নাহার সুমি, জামাই মোঃ ইসমাইল, মেয়ে নুর নাহার লিপি জামাই আবুল হোসনাত খোকনের নাম বন্দোবস্ত নিয়েছেন এসব জমি। বন্দোবস্ত পাওয়ার পর শাহ আলমদের বাড়িতে আসা যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এখন একটার পর একটা মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন।
শাহ আলমের বাবা আলী আহমদ পাটওয়ারী(৭৫) জানান, আমার কোন নিজস্ব জায়গা সম্পত্তি নেই। ১৯৮১-৮২ সালের দিকে ভূমিহীন হিসেবে বর্তমান বসতির খাস জমিটিতে ঘর তৈরি করে পরিবার নিয়ে বসবাস ও চাষাবাদ করি। জমিটি বন্দোবস্ত নেওয়ার জন্য তৎকালীন স্থানীয় ভূমি অফিসে গেলে দেখা হয় প্রতিবেশী ও দালাল আবুল কালামের সাথে। ঘটনাটি শুনে আবু মিয়া আমার দখলে থাকা ৬৯ শতক খাস জমি বন্দোবস্ত পাইয়ে ১ লাখ টাকা অফিস খরচের দাবি করেন। কিছুদিন পর আমি সরল বিশ্বাসে স্থানীয় কিছু লোকজনের উপস্থিতি আমি তাকে ৮০ হাজার টাকা দিই।
কিছুদিন পর আবু কালাম (আবু মিয়া) আমার জমি বন্দোবস্ত হয়েছে বলে আমাকে জানায়। আমি লেখাপড়া জানি না। তার কাছ থেকে জমির কাগজপত্র দেখতে চাইলে সে জানায় তার নিকট কাগজ নিরাপদে রয়েছে। তার কথা বিশ্বাস করি।
আলী আহমেদ পাটোয়ারী বলেন, ২০২২ সালের ১ এপ্রিল আবু মিয়া মারা যান। আমার ছেলে শাহ আলমসহ আমরা আবু মিয়ার জানাযায় উপস্থিত হয়ে শতশত গ্রামবাসীর সামনে আমাদের জমিনের বন্দোবস্তের নথি দাবী করি। তখন তার ওয়ারিশদের মাধ্যমে জানতে পারি আবু মিয়া আমাদের বসতবাড়ির ৬৯শতক জমিসহ পুরো ১৯৫ শতক তার নামে, স্ত্রী নামে, ৩ মেয়ে এবং ৩ জামাইয় সহ পরিবারের ৮ জনের নামে বন্দোবস্ত নিয়েছেন। দীর্ঘদিন বিষয়টি গোপন রেখেছিল।
তখন জানাযায় উপস্থিত শতশত গ্রামবাসীর সামনে তার ৩ মেয়ে ও ৩ জামাই কথা দিয়েছিল তাদের নামে বন্দোবস্ত নেওয়া আমাদের বসতবাড়ির জমি আমাদেরকে ফেরত দেবে।
ভূক্তভোগী শাহ আলম বলেন, লাশ দাফনের পর মেয়ে ও জামাইরা একত্রি হয়ে আমাদেরকে বাস্তুচ্যুত করার জন্য একটি মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেন।
কমলনগর উপজেলা ভূমি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানা গেছে, কোন ব্যক্তির নামে সরকারি জমি বন্দোবস্ত পেতে হলে তাকে ওই ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং শতভাগ ভূমিহীন হতে হয়। কাংখিত ভূমিটি ওই ব্যক্তির দখলে থাকতে হয়। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওই ব্যক্তিকে ভূমিহীন হিসেবে নাগরিক সনদসহ ভূমিহীন প্রত্যায়নপত্র প্রদান করে। তবে একই পরিবারের একাধিক সদস্য এক সাথে ভূমিহীনের জমি বন্দোবস্ত পাওয়ার নিয়ম নেই।
স্থানীয়ভাবে খোজঁ নিয়ে এবং বিভিন্ন দালিলিক কাগজপত্র দেখে জানা গেছে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভূমিহীন সেজে ১৯৫ শতক খাস জমি বন্দোবস্ত নেয়া মরহুম আবুল কালামের পরিবারের ৮ সদস্য কেউ ভূমিহীন ছিল না। তাদের কেউই ওই জমিতে দখলে ছিল না। ৩ মেয়ে প্রত্যেকে মার্টিন ও তোরাবগঞ্জ ইউনিয়নে স্বামীদের বাড়িতে বসবাস করেন। মেয়ের জামাই প্রত্যেকেই আগে থেকে ভূমির মালিক, দালান বাড়ি এবং কোটিপতি লোক। স্ত্রী শাহিনুর বেগমের নামেও একাধিক খতিয়ানে জমি ছিল।
অন্যদিকে মরহুম আবুল কালাম নিজেও ভূমিহীন ছিল না। উত্তর চর লরেঞ্চ মৌজার ২৫৯ নং দাগের যে ৬৫ শতক জমি নিজে ও স্ত্রী শাহিনুর বেগমের নামে বন্দোবস্ত নিয়েছিলেন সেই জমিতে বিগত ১৯৮১ সাল থেকে ভূমিহীন শাহে আলমের পরিবার বাড়িঘর করে বসবাস করছেন। আবুল কালাম সে জমি বন্দোবস্ত নিয়েছিলেন ২০১৩-২০১৪ সালে। তার আগের বছর ২০১২/১৩ বছরেও আবুল কালাম ও শাহিনুর বেগম ৩৯ শতক জমি বন্দোবস্ত নেয় যার খতিয়ান নং ১৭০৪।
নিজেদেকে মিথ্যা ভূমিহীন ঘোষণা দিয়ে দূর্নীতিবাজ কিছু কর্মকর্তাদের সাহায্যে একএকজন পরপর দুইবার বন্দোবস্ত নেয়াহয়,

