মোঃ জাকের হোসেন
হাতিয়া প্রতিনিধি :
নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে বিশাল মাছের আড়ৎ। বর্ষায় প্রবল ঢেউয়ের আঘাতে ভেঙ্গে গেছে এর এক অংশ। মূল ঘাট থেকে ১০-১৫টি দোকান ইতিমধ্যে স্থানান্তর করতে হয়েছে। এখন ভাংচে মূল বাজারটি । ভাঙ্গন আতংকে দিন কাটছে এই ঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা প্রায় সহশ্রাধিক দোকানের মালিক ও ব্যবসায়ীর।
নোয়াখালী দক্ষিনাঞ্চলের সব চেয়ে বড় মাছের আড়ৎ হাতিয়ার চেয়ারম্যান ঘাট। এখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ৫ হাজার ছোটবড় মাছধরা ট্রলার মাছ বেচাকিনা করে। গত দুই যুগ ধরে চলতে থাকা এই ঘাটটি বিশাল ব্যবসায়ীক কেন্দ্রে রুপান্তির হয়েছে। ঢাকা-চট্রগ্রাম ও চাঁদপুরের বড় বড় পাইকররা এই ঘাট থেকে মাছ কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে থাকে। সাগর মোহনা ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ার কারনে এই ঘাটে আমদানি রপ্তানি অনেক বেশি।
উপজেলার হরনী ইউনিয়নের দক্ষিন পশ্চিম অংশে এই ঘাটের অবস্থান। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ভোলা মনপুরা বরিশাল ও চাঁদপুর থেকে আসা জেলেদের হাঁকডাকে সরগরম হয়ে উঠে এই ঘাট। সম্প্রতি তীব্র নদী ভাঙ্গনে আক্রান্ত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই ঘাট। গত বছর দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এর একাংশ নদীতে বিলীণ হয়ে গেছে। এখন ভাঙ্গছে মূল বাজার। এতে এই ঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা ব্যবসায়ীদের দোকান ও বাড়ী ঘর নিয়ে বিপাকে পড়েছে সবাই। একদিগে বাসস্থান, অন্যদিগে ব্যবসায়ীক কেন্দ্র এক সাথে আক্রান্ত হওয়ায় চোখে মূখে অন্ধকার দেখেছে সবাই।
চেয়ারম্যান ঘাটের প্রবিন মাছ ব্যবসায়ী আকবর হোসেন জানান, এই ঘাটে মৌসুমে প্রতিদিন ৫০ কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়। জেলা সদররের সাথে সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় ট্রাকে করে এসব মাছ রাজধানী সহ বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যায় কয়েক ঘন্টায়। চাঁদপুর, বরিশাল এখন আর আগের মতো মাছ নিয়ে ফিসিং ট্রলার যায় না। কারন তাদের জ্বালাণী খরচ অনেক বেশি পড়ে যায়। তারা সহজে সাগর থেকে এসে চেয়ারম্যান ঘাটে মাছ বিক্রি করে আইস নিয়ে আবার সাগরে চলে যায়। প্রতিদিন শতাধিক ট্রলার আসা যাওয়ার উপর থাকে। এজন্য এই ঘাটটি গত ২০ বছরে বিশাল বানিজ্যিক ঘাটে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরো জানান, এই ঘাটকে কেন্দ্র করে প্রায় সহশ্রাধিক পাকা আধা-পাকা দোকান ঘর তৈরি হয়েছে। যাতে ব্যবসা করে কয়েক হাজার মানুষ। এছাড়াও আছে পুলিশ ফাঁড়ি, আইস ফ্যাক্টরি সহ বিভিন্ন স্থাপনা। হঠাৎ নদীতে ভাঙ্গন সৃষ্টি হওয়ায় আতংক বিরাজ করছে সবার মধ্যে। বাড়ি ঘর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুনরায় স্থাপন করা নিয়ে শংকায় আছে সবাই।
মাছ ঘাটের এক কোনে চায়ের দোকান করে নুর উদ্দিন নামে একজন। নুর উদ্দিন জানান, তার তিন ছেলে সবাই মাছ ঘাটের শ্রমিক হিসাবে কাজ করে। বয়স হওয়ায় তিনি এই চায়ের দোকান চালিয়ে পরিবারের ব্যায় নির্বাহ করেন। ঘাটের পূর্ব পাশে বেড়ির ঢালে তার বসবাস। পরিবারের ৮ সদস্যকে নিয়ে সেখানে বসবাস করেন। এখন নদী ভাঙ্গনে কবলে পড়েছে ঘাটটি। ঘাট ভেঙ্গে গেলে নিজেদের কর্মস্থল হারাতে হবে। হারাতে হবে নিজেদের ভিটেমাটি। এই চিন্তায় চোখে মূখে অন্ধকার দেখছেন ষাটার্ধ্বো এই বৃদ্ধ।
চেয়ারম্যান ঘাটের সাদিয়া ফিস এজেন্সীর পরিচালক মো: বাবু জানান, নদী ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে এখন বাজারের একেবারে দক্ষিন পাশে চলে এসেছে। নৌকা গুলো মাছ বিক্রি করতে বাজারের পাশে নঙর করলে ঢেউয়ের আগাতে টিকতে পারে না। গত বছর বাজারের মেইন সেডের একাংশ ভেঙ্গে গেছে। তাতে ১০-১৫ টি মাছের গদি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েচে। বর্ষায় এই পাশ দিয়ে প্রবল বাতাশে বাজারে মাছ বেচাকিনা অনেক সমস্যা হয়।
চেয়ারম্যান মাছ ব্যবসাযী সমিতির সভাপতি সাহেদ উদ্দিন জানান, ঘাটটি নদী ভাঙ্গন থেকে রক্ষা করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেও কোন সুফল পাওয়া যায়নি । এই বছর বর্ষা শেষে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আগামীতে এখানে ব্যবসা করা যাবে না বলে জানান তিনি।
সাহেদ উদ্দিন আরো জানায়, এই বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেও কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি। এই ঘাট থেকে সরকার প্রতিবছর বিশাল অংকের টাকা টেক্স পায়। এখানে মাছ ঘাটের পাশাপাশি ফেরি ঘাট ও সিট্রাক ঘাট রয়েছে। যাতে দ্বীপ হাতিয়ার সকল ধরনের মালামাল আনা নেওয়া করা হয়। সম্প্রতি ফেরী ঘাটকে কেন্দ্র করে সরকার যাত্রী ছাউনি সহ অনেক গুলো স্থাপনা তৈরি করেছেন। এ সব এখন ভাঙ্গনের কবলে।
এই বিষয়ে নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জামিল উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, সম্প্রতি এই ঘাট রক্ষায় জরুরী ভিত্তিতে জিও ব্যাগ পেলে কিছুটা ভাঙ্গন রক্ষা করা গেছে। তবে স্থায়ী ভাবে ব্লকবাঁধ দিয়ে কাজ করার জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তা বাস্তবায়ন করা হলে রক্ষা পাবে ঐতিহ্যবাহী এই ঘাট।