
যীশু সেন
ধর্ম মানুষের আত্মিক ও নৈতিক বিকাশের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ধর্ম মানুষকে কেবল উপাসনার পদ্ধতি শেখায় না; শেখায় কীভাবে মানুষ হতে হয়। সত্য, ন্যায়, সংযম, দয়া, ক্ষমা, সহমর্মিতা, বিনয় ও পরোপকার—এসব মানবিক গুণের বিকাশই ধর্মচর্চার মূল উদ্দেশ্য। বাহ্যিক আচার, আনুষ্ঠানিকতা ও ধর্মীয় পরিচয় ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হতে পারে; কিন্তু সেগুলোর প্রতিফলন যদি মানুষের চরিত্র ও আচরণে না ঘটে, তাহলে সেই ধর্মচর্চার অন্তর্নিহিত সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য যেখানে আত্মশুদ্ধি, সেখানে সমাজে কখনো কখনো তার বিপরীত এক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে—আত্মপ্রচার। ধর্মীয় পরিচয়, মঞ্চ, সংগঠন, পদ-পদবি, সম্মাননা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নানা আনুষ্ঠানিকতাকে ব্যবহার করে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার প্রতিযোগিতা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। ধর্ম তখন আত্মজিজ্ঞাসা ও নৈতিক অনুশীলনের বিষয় না হয়ে ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে পড়ছে।
একজন মানুষ কতবার উপাসনালয়ে গেলেন, কতটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিলেন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কত ছবি প্রকাশ করলেন—এসব দিয়ে ধার্মিকতার প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না। ধর্মের আসল পরীক্ষা হয় মানুষের নীরব জীবনে। অন্যায়ের সুযোগ পেলে তিনি কী করেন, দুর্বল ও অসহায় মানুষের সঙ্গে তাঁর আচরণ কেমন, কিংবা ক্ষমতা হাতে এলে বিনয়ী থাকতে পারেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরেই মানুষের ধর্মীয় চেতনার প্রকৃত পরিচয় নিহিত।
ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য। এসব সংগঠনের পদ কোনো ব্যক্তিগত অলংকার বা মর্যাদা প্রদর্শনের লাইসেন্স নয়। নেতৃত্বের প্রকৃত ভিত্তি হওয়া উচিত সততা, যোগ্যতা, ত্যাগ, সেবার মানসিকতা ও জবাবদিহি। পদ দখল যদি যোগ্যতার পরিবর্তে প্রভাবের ফল হয়, তাহলে সংগঠনের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
একইভাবে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিয়মতান্ত্রিক হিসাব থাকা জরুরি। বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সামান্য অস্পষ্টতাও বড় ধরনের অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে কাজের চেয়ে কাজের প্রচার বড় হয়ে দাঁড়ানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আত্মশুদ্ধি মানুষকে নিজের ভেতরের দিকে তাকাতে শেখায়, আর আত্মপ্রচার শেখায় অন্যের দৃষ্টির দিকে তাকাতে। ধর্মের নামে বিভাজন বা অহংকার বাড়লে সেখানে আত্মশুদ্ধির ঘাটতি থাকে।
সবশেষে, ধর্মের প্রকৃত সাধনা অন্যকে বদলানোর আগে নিজেকে বদলানোর সাধনা। প্রচারের আলো নয়, কর্মের আলোই মানুষের আসল পরিচয় বহন করে। ধর্মের সবচেয়ে বড় প্রচারক কোনো বক্তা নন—একজন সৎ মানুষ। আর ধর্মের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয় কোনো পদবি নয়—একটি নির্মল চরিত্র। ধর্ম হোক আত্মশুদ্ধির আয়না, আত্মপ্রচারের মঞ্চ নয়।