
উজ্জ্বল কুমার সরকার, নওগাঁ:
পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় দশক ধরে সংবাদপত্র শিল্পের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত আছেন নওগাঁ শহরের মন্ডলপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রবীণ সংবাদপত্র এজেন্ট জাকের আলী (৭৫)। শহরের সরকারি খাদ্য বিভাগের (এলএসডি) গোডাউনের পেছনের এই বাসিন্দা এ যুগের সংবাদপত্র শিল্পের এক সার্থক রানার।
তার এই পথচলার শুরুটা হয়েছিল তৎকালীন বরেণ্য সংবাদপত্র এজেন্ট আব্দুল জলিলের হাত ধরে। পরবর্তী সময়ে নিজের এজেন্সি পরিচালনার ক্ষেত্রে নওগাঁর কিংবদন্তি ঐতিহাসিক ও সাংবাদিক খান সাহেব মোহাম্মদ আফজাল তাকে নানা দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা প্রদান করেন।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রিন্ট মিডিয়ার দুর্দিন চললেও অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন জাকের ভাই। তার ভাষ্যমতে, একসময় তিনি শতাধিক বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক ও ত্রৈমাসিক পত্রিকার জেলা এজেন্সি পরিচালনা করতেন। জাতীয় পত্রিকার পাশাপাশি ভারতীয় বাংলা ম্যাগাজিন—যেমন দেশ, সানন্দা, আনন্দবাজারসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও স্থানীয় পত্রিকা তার এজেন্সির মাধ্যমে সরবরাহ করা হতো। সময়ের বিবর্তনে পাঠকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বর্তমানে তিনি এজেন্সির পরিসর কিছুটা সীমিত করেছেন।
দীর্ঘ এই কর্মজীবনে নওগাঁ ব্রিজের মোড়, পুরাতন ওষুধ পট্টি, খান কনফেকশনারির সামনের অংশ, পৌর মার্কেটের দোতলার বারান্দা এবং গাঁজা সমবায় সমিতির প্রাঙ্গণসহ বিভিন্ন স্থানে তার সংবাদপত্র বিতরণের কেন্দ্র ছিল। বর্তমানে তিনি গাঁজা সমবায় সমিতির সংলগ্ন সামনের মার্কেট এবং নওগাঁ নওজোয়ান মাঠের বিপরীত পাশের মূল সড়কের পূর্ব দিকের ফুটপাতে বসে এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে ভোর থেকে বেলা ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত তিনি হকারদের মাঝে পত্রিকা বিতরণের কাজ করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে নওগাঁ এটিএম মাঠসংলগ্ন ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা জাকের আলী পারিবারিক দৈন্যদশার কারণে পড়ালেখা আর বেশিদূর চালিয়ে যেতে পারেননি। সংসারের হাল ধরতে বেছে নেন এই পেশা। নিজে কষ্ট সহ্য করলেও দুই ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। বর্তমানে তার এক ছেলে চিকিৎসক এবং অন্য ছেলে স্বাস্থ্য বিভাগে চাকরি করছেন।
অত্যন্ত মানবিক ও সহজ-সরল জীবনযাপনের জন্য জাকের আলী নওগাঁবাসীর কাছে দারুণভাবে সমাদৃত। আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে প্রতিবেশীদের বিপদে-আপদে সবসময় পাশে থাকার চেষ্টা করেন তিনি।
সমাজের সাধারণ মানুষের ভিড়ে এমন নিবেদিতপ্রাণ মানুষের গল্প ও স্মৃতিগুলো আমাদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকে। আমরা তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।