
মোঃ হামিদুল ইসলাম
কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি
কুড়িগ্রামের রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজে তীব্র শিক্ষক সংকটে সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থীর একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ৬০ জন শিক্ষকের পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৮ জন, অর্থাৎ শূন্য রয়েছে ৩২টি পদ। এর মধ্যে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো শিক্ষক না থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দীর্ঘ ৫৩ বছর পর স্থায়ী অধ্যক্ষ হিসেবে ২২তম বিসিএস ক্যাডার প্রফেসর মো. জহুরুল হক গত ৮ জুন ২০২৬ তারিখে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কলেজের ৩৩টি ব্যাংক হিসাবের মধ্যে ১৬টিতে অর্থ পান এবং কয়েকটিতে সামান্য পরিমাণ অর্থ বা কোনো টাকাই পাননি। একটি চলতি হিসাবে জমা ছিল মাত্র ৩০০ টাকা। এমন আর্থিক সংকটের মধ্যেও তিনি অতিথি শিক্ষক ও মাস্টাররোল কর্মচারীদের দুই মাসের বকেয়া বেতন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিশোধ করেন। শিক্ষক সংকট দূর করতে ১২ জন নতুন অতিথি শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বর্তমানে তিনজন অতিথি শিক্ষক কাজ করছেন।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৩ সালে মীর মুহঃ হাবিবুল্লাহর মাধ্যমে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়ে আসছিল এবং ২০১৮ সালে এটি সরকারি করা হয়। বর্তমানে কলেজটিতে একাদশ, দ্বাদশ, স্নাতক ও ছয়টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু রয়েছে। দীর্ঘদিন স্থায়ী অধ্যক্ষ না থাকায় প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
নতুন অধ্যক্ষ যোগদানের পর কলেজটিতে নানা পরিবর্তন এসেছে। প্রভাষক সাহেব আলী জানান, ৩২টি শূন্য পদের পাশাপাশি গ্রন্থাগারিক, শরীরচর্চা শিক্ষক ও প্রদর্শক পদেও জনবল সংকট রয়েছে। প্রভাষক তপতি রানী বলেন, “শিক্ষক ঘাটতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে বিজ্ঞান বিভাগে। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় পাঠদান ও ব্যবহারিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে, এমনকি দীর্ঘদিন ব্যবহারিক কক্ষটি অব্যবহৃত পড়ে থাকায় আসন থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থী ভর্তি কমে যাচ্ছে।” দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সিরাতুন বিনতে বুশরা জানান, শিক্ষক সংকটের কারণে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েও তিনি মানবিক বিভাগে ভর্তি হতে বাধ্য হয়েছেন।
এদিকে নতুন অধ্যক্ষের যোগদানের পর প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন শুরু হয়েছে। নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষককে মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শ্রেণিকক্ষে ফ্যান সংযোজন, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, ল্যাব সংস্কার, সীমানাপ্রাচীর ও ছাত্রীদের বাথরুম মেরামতসহ পুরোনো ভবনের সংস্কার কাজ চলছে।
সহকারী অধ্যাপক সাজেদুর রহমান মণ্ডল জানান, দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় যে দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে বর্তমানে সবাই দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছেন।
অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. জহুরুল হক জানান, কলেজে নানামুখী সমস্যা রয়েছে। তবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অতিথি শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে সংকট সমাধানের চেষ্টা চলছে। শিক্ষার প্রকৃত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় সুশীল সমাজের সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টদের মতে, ৬০ পদের বিপরীতে ৩২টি পদ শূন্য থাকাটাই মূল চ্যালেঞ্জ। দ্রুত এই শিক্ষক সংকট নিরসন করা গেলে কলেজটিতে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ ও মানসম্মত ফলাফল ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।