নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন: নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা সফল ?
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইন বাংলাদেশে কোনো নতুন বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ধরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ ও এর বিভিন্ন সংশোধিত রূপ দেশে কার্যকর ও বলবৎ রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালে বাংলাদেশ “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২৬” এর মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের বিরুদ্ধে আরো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যেখানে যৌন হয়রানির সংজ্ঞা সম্প্রসারণ, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সুরক্ষা বৃদ্ধি এবং বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততর করার মতো বিষয়গুলো এই সংশোধিত আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। যা সংসদে পাস ও ১০ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে।
কিন্তু এই নারী ও শিশু নির্যাতন আইন কার্যকর থাকা সত্ত্বেও তা কতটা দেশের নারী ও শিশুদের সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকার অধিকার ও নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করছে তা বলা কঠিন। কেনো না কোনো আইনের কার্যকারিতা শুধু তার কঠোরতার ওপর নির্ভর করে না বরং তার যথাযথ বাস্তবায়ন, বিচারপ্রাপ্তির সহজলভ্যতা এবং সামাজিক সচেতনতার ওপরই গুরুত্বপূর্ণভাবে নির্ভরশীল। আর ২০২৬ সালের জানুয়ারি–জুন (প্রথম ৬ মাস) পর্যন্ত বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য থেকে একটি ধারণা পাওয়া যায়।
তথ্যসূত্র -১: মানবাধিকার সংস্থা HRSS-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১,৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৪টি ধর্ষণের ঘটনা ছিল এবং ৪৭৩ জন যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।
তথ্যসূত্র -২: একই সময়ে দ্য ডেইলি স্টার এর একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় ১,০৭৭ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩০৫ জন নিহত এবং ৭৭২ জন শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
তথ্যসূত্র -৩: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK)-এর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি–জুন ২০২৬ সময়ে ৪৯০ জন শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ১৯৫ জন নিহত। এছাড়া ৩১৯টি ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় নারী ভুক্তভোগী ছিলেন।
তথ্যসূত্র -৪: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এর প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল ২০২৬ মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত ২,০১১টি মামলা দায়ের হয়, যা আগের কয়েক মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে নতুন আইন কার্যকর হলেও নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অতএব, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু আইনের কঠোরতা নয়, এর কার্যকর বাস্তবায়ন, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার, ভুক্তভোগীদের সহায়তা এবং সর্বোপরি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, পরিবার এবং সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে কোনো নারী বা শিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয় নিয়ে নয়, বরং নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমঅধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে। তখনই এই আইনের প্রকৃত সফলতা অর্জিত হবে।
সামিয়া আক্তার মুন,ঢা বি//