
মোঃ জাকের হোসেন, হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি:
টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ, জোয়ারের পানি এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার কৃষি খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় আউস ধান, আমন বীজতলা, মৌসুমি সবজি, ফল, মরিচ ও পানের বরজসহ প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন উপজেলার প্রায় ৮০ হাজার কৃষক। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী কৃষকদের ৩০ কোটি টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, টানা বর্ষণে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রায় ২১ হাজার ৫২০ হেক্টর আউস ধান, ১ হাজার ৯২০ হেক্টর আমন বীজতলা, ৯৫০ হেক্টর মৌসুমি শাকসবজি, ৫৮ হেক্টর ফলের বাগান, ৪ হেক্টর মরিচ এবং ১০ হেক্টর পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বমোট ৮০ হাজার কৃষক সরাসরি এই ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
সরেজমিনে উপজেলার চরকিং ইউনিয়নের চরকৈলাশ গ্রামে গিয়ে দেখা যায় কৃষক কামাল উদ্দিনের বিষণ্ণ মুখ। তিনি জানান, গত ১০ দিন আগে ৩০ শতাংশ জমিতে ৬০ কেজি আমনের বীজ বপন করেছিলেন। টানা বর্ষণে তাঁর বীজতলাটি পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে যায়। পরে বীজতলার চারপাশে উঁচু আইল বেঁধে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। পানি কমার সাথে সাথে ছোট ছোট ধানের চারাগুলো নুয়ে পড়ে পচে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে নতুন করে বীজ বপনের চিন্তা করছেন তিনি। তবে এজন্য মোটা অঙ্কের বাড়তি টাকা খরচ করতে হবে ভেবে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন এই কৃষক।
শুধু কামাল উদ্দিনই নন, উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার সব এলাকার কৃষকদের অবস্থাই এখন এক। উপজেলার চরকিং ও চরঈশ্বর ইউনিয়ন এলাকা সবজি চাষের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ভারি বর্ষণে এই দুই ইউনিয়নের অধিকাংশ সবজি খেত তলিয়ে গেছে। পানি নামতে শুরু করলেও গোড়ায় পচন ধরে মরে যাচ্ছে শাকসবজি গাছ। অনেক কৃষক নিজের সম্বল বিক্রি করে কিংবা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সবজি চাষ শুরু করেছিলেন, তারা এখন দিশেহারা হয়ে ক্ষেতের পাশে বসে আছেন।
চরঈশ্বর ইউনিয়নের পূর্ব গামছাখালী গ্রামে বারো মাসই সবজি চাষ হয়। বুধবার বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, হকসাব নামের এক কৃষক তাঁর জমির সবজি গাছগুলো টেনে তুলে ফেলছেন। তিনি জানান, প্রায় এক একর জমিতে জিংগা চাষ করেছিলেন। সবজি পরিপক্ক হওয়ার আগেই টানা বৃষ্টিতে গাছের গোড়া পচে গেছে। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তৈরি করা এই ক্ষেতে তাঁর প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। কিন্তু বিক্রির মুখ দেখার আগেই সব শেষ। এখন নতুন করে দাঁড়াতে সরকারি সহায়তা চান তিনি।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, অতীতে সরকারিভাবে শুধু বীজ, সার ও কীটনাশক দেওয়া হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে নগদ অর্থ সহায়তা না দিলে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না। কারণ অনেকেরই মূলধন পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল বাছেদ সবুজ জানান, "প্রতিটি ইউনিয়নে আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। টানা বৃষ্টিতে হাতিয়ার কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে ইউনিয়নভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত প্রতিবেদন জেলা কার্যালয়ে পাঠিয়েছি। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি বরাদ্দ ও প্রণোদনা চলে আসবে।"