
উজ্জ্বল কুমার সরকার, নওগাঁ।
আজ ৮ জুলাই, বীর মুক্তিযোদ্ধা অঞ্জলি রায় গুপ্তার জন্মদিন। ১৯৪৫ সালের এই দিনে ঝালকাঠির কীর্তিপাশা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী এই মহীয়সী নারী কেবল একজন শিক্ষাবিদই ছিলেন না, ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন নির্ভীক যোদ্ধা।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
অঞ্জলি রায় গুপ্তার বাবার নাম সুশীল কুমার রায় এবং মায়ের নাম শোভা রাণী রায়। তিনি ১৯৬১ সালে কীর্তিপাশা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তীতে বরিশালের চাখার ফজলুল হক কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে তিনি ঝালকাঠির শিরযুগ আজিমুন্নেছা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও শপথ
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে অঞ্জলি রায় গুপ্তা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ঝালকাঠির কীর্তিপাশা গ্রামে পাক বাহিনীর অগ্নিসংযোগে তাদের পৈতৃক ভিটা ভস্মীভূত হলে পরিবারসহ তারা বিপর্যয়ের মুখে পড়েন। পুড়ে যাওয়া বাড়ির ছাই হাতে নিয়ে পাঁচ ভাইবোন—শ্যামল রায়, অঞ্জলি, সন্ধ্যা, মণিকা ও সুদীপ্তা—দেশকে শত্রুমুক্ত করার শপথ নেন।
নয় নম্বর সেক্টরের আওতায় সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বে তারা পেয়ারাবাগানে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। নবগ্রাম ও বিনয়কাঠি ইউনিয়নে পাক বাহিনীর নৌকায় আক্রমণ চালিয়ে সফল অভিযান পরিচালনা করেন এই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলতেন, পাক বাহিনীর ঘেরাও থেকে বাঁচতে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে জীবন বাঁচানোর সেই স্মৃতি আজও শিহরিত করে।
স্বাধীনতার পর ও শেষ জীবন
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অঞ্জলি রায় পুনরায় শিক্ষকতা পেশায় ফিরে আসেন। তার নিরলস প্রচেষ্টায় শিরযুগ আজিমুন্নেছা বিদ্যালয়টি কলেজ পর্যায়ে উন্নীত হয়। ২০০৮ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ও ত্যাগের মহিমা ধারণ করা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ২০০৫ সালের ৫ নভেম্বর মেয়ে সুমনা গুপ্তার বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পাঁচ ভাইবোন সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও সরকারি সনদ পেয়েছেন মাত্র দু’জন। অবহেলা ও অভিমানে অন্য দুই বোন ভারতের স্থায়ী আবাস গড়েছেন এবং সনদ গ্রহণের আগ্রহও দেখাননি।
আজকের এই দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধা অঞ্জলি রায় গুপ্তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের জন্য দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।