বগুড়া প্রতিনিধি:
বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার খরনা ইউনিয়নের ভাদাইকান্দি গ্রামে এক যুবকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জাহিদ হাসান ওরফে জার্জিস (৩৮) ও তাঁর নেতৃত্বাধীন কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডবে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্থানীয় কয়েকটি পরিবার। মবের আশঙ্কায় গত ১০ মাস ধরে গ্রামের ৫টি বাড়ির ১৩টি পরিবারের অন্তত ৬০ জন সদস্য নিজ ভিটেমাটিছাড়া। জীবনের ভয়ে জেলার বিভিন্ন স্থানে আশ্রিত এসব পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এমনকি নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ ভুক্তভোগী পরিবারের কোনো সদস্য গত ঈদুল আজহাও নিজ বাড়িতে উদযাপন করতে পারেননি।
ঘটনার সূত্রপাত
জানা যায়, ২০২৫ সালের ২ আগস্ট আল আমিন নামের এক যুবক বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নিহত আল আমিন স্থানীয় জাহিদ হাসান ওরফে জার্জিসের ভাতিজা ছিলেন। আল আমিনের মৃত্যুর পর জার্জিস বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ রয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সাথে কোনো সম্পৃক্ততা না থাকলেও পূর্বশত্রুতা ও ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে ওই মামলায় আসামি করা হয়েছে।
মবের তাণ্ডব ও লুটপাট
অভিযোগ উঠেছে, আল আমিনের মৃত্যুকে পুঁজি করে জার্জিস ও তার সহযোগীরা এলাকায় ‘মব’ বা গণপিটুনি-জাতীয় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। এরপরই আসামিদের বাড়িতে একযোগে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ সময় বাড়ি থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র লুট এবং গোয়াল থেকে গরু-ছাগল পর্যন্ত নিয়ে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা আদালতে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেছেন।
ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ
ভুক্তভোগী কৃষক আব্দুল আজিজ (৬০) বলেন, “আল আমিনের ঘটনার সাথে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। অথচ জার্জিস ও তার দলবল আমার বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। এতে আমার অন্তত ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। গ্রামে আমার ৯ বিঘা জমি রয়েছে, যা থেকে আমার আট সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ চলত। এখন ভয়ে বাড়ি ফিরতে না পারায় জমি চাষ করতে পারছি না।”
কৃষক আলহাজ্ব নুরুল ইসলাম (৭৮) জানান, জার্জিস অন্যায়ভাবে তার একটি জমি নিজের বলে দাবি করে আসছিল। আল আমিনের মৃত্যুর ঘটনাকে পুঁজি করে জার্জিস তার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। এতে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং ৪০ বিঘা জমি অনাবাদি পড়ে আছে।
হাসনা হেনা (২৬) নামের এক গৃহবধূ বলেন, হামলার সময় পুলিশ এসে তাকে ও তার তিন সন্তানকে উদ্ধার করেছিল। বর্তমানে সন্তানদের পড়াশোনা পুরোপুরি বন্ধ এবং তারা অন্যের আশ্রয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
দাখিল পরীক্ষার্থী আম্বিয়া খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কোনো অপরাধ না করেও আজ আমরা মবের শিকার। ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে, এমনকি গোয়াল খালি করা হয়েছে। অন্যের বাড়িতে থেকে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে, এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু ভালো।”
অভিযুক্ত ও পুলিশের বক্তব্য
অভিযুক্ত জাহিদ হাসান জার্জিসের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে বলেন, “কেন বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে, তা গ্রামে এসে শুনে বিচার করে তারপরে যাবেন।” কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি হুমকির সুরে বলেন, “গ্রামে আসেন, ফোনে এসব বলা যাবে না।”
শাজাহানপুর থানার এসআই আব্দুর রহিম বলেন, ঘটনার দিন ৯৯৯-এ কল পেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ফোর্সসহ ভাদাইকান্দি গ্রামে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি জার্জিস ও তার লোকজন কয়েকটি বাড়িতে ভাঙচুর চালাচ্ছে। আতঙ্কিত নারী ও শিশুদের উদ্ধারের সময় পুলিশ সদস্যদেরও ভয়াবহ মবের মুখে পড়তে হয়েছিল, যেখানে জীবন রক্ষা করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল।
শাজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিক ইকবাল বলেন, “বিষয়টি আমি শুনেছি। পুলিশের পক্ষে সব সময় বাড়িতে বাড়িতে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে মব তৈরি করে এখন আর কেউ পার পাবে না। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করে নিজেদের জানমালের নিরাপত্তা এবং মব সৃষ্টিকারী ও লুটপাটকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।