মোঃ মাসুদ রানা মনি, লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধি
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার সাড়ে চার লাখ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা রামগঞ্জ সরকারি হাসপাতালটি নিজেই এখন নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে ধুঁকছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে গত দুই দশক ধরে চলা এক চরম প্রশাসনিক অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার চিত্র।
রোববার রাত ৩টায় হাসপাতালটিতে সরেজমিনে দেখা যায়, ১০৩ জন রোগীর গাদাগাদি অবস্থা। শয্যা না পেয়ে রোগীরা মেঝে, বারান্দা ও অন্যের বিছানার পাশে শুয়ে আছেন। তীব্র লোডশেডিংয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে রোগীদের শেষ সম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে হাতে থাকা মোবাইলের টর্চলাইট। গরমে হাঁসফাঁস করা রোগীদের জন্য একটি ফ্যান থাকলেও তা অকেজো। এই প্রতিকূলতায় পুরো হাসপাতাল সামলাচ্ছেন মাত্র কয়েকজন নার্স, আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ভার এক ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধের ওপর।
সূত্রমতে, ২০০৪ সালে হাসপাতালটি ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০০৫ সালে ভবন নির্মাণ শুরু হয়ে ২০১২ সালে প্রশাসনিক ভবন হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু ভবন ও শয্যা বাড়লেও বাড়েনি জনবল। ২০১২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত সাতবার চিঠি চালাচালি হলেও জনবল নিয়োগের ‘প্রশাসনিক অনুমোদন’ আর মেলেনি। ২০২২ সাল থেকে হাসপাতালটি কাগজে-কলমে ৫০ শয্যায় চললেও জনবল রয়ে গেছে ৩১ শয্যারও অর্ধেকের কম।
হাসপাতালের পরিসংখ্যানবিদ মো. গিয়াছ উদ্দিন ভূঁইয়া আক্ষেপ করে বলেন, "গত ১৫ বছর এমপি, চেয়ারম্যান সবার দ্বারে দ্বারে গিয়েছি। সবাই শুধু আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু প্রশাসনিক অনুমোদনের কাজ কেউ করেননি।"
৫০ শয্যার হাসপাতালে ৪৫ জন নার্স থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ১৯ জন। ৫ জন সুইপারের স্থলে ১ জন, ৩ জন ওয়ার্ড বয়ের জায়গায় ১ জন এবং ২ জন আয়ার স্থলে ১ জন কর্মরত আছেন। নেই কোনো নৈশপ্রহরী বা মালি। হাসপাতালের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটির চালক এক বছর বেতন না পেয়ে চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ায় সেটি এখন অকেজো।
এছাড়া উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র দুটিতে চিকিৎসক আছেন। বাকি ৮টি সাব-সেন্টার চিকিৎসক ও জনবলহীন অবস্থায় বছরের পর বছর পড়ে আছে।
প্রতিদিন আউটডোরে ৭০০-৮০০ এবং ইনডোরে প্রায় ১৩০ জন রোগী চিকিৎসা নিলেও খাবার বরাদ্দ জোটে মাত্র ৫০ জনের। মাসের ২০ তারিখের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় সাধারণ ওষুধের স্টক। আব্দুর রহিম নামে এক রোগীর স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এত নোংরা পরিবেশ কোথাও দেখিনি। এখানে এসে আমার ছেলে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে।" এছাড়া দাঁতের চিকিৎসার একমাত্র চেয়ারটি অকেজো এবং জেনারেটর না থাকায় লোডশেডিংয়ে ল্যাব পরীক্ষা বন্ধ থাকে।
লক্ষ্মীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন জনবল সংকটের বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী আতিকুর রহমান সংকটের কথা স্বীকার করেছেন।
সদ্য যোগ দেওয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোস্তাক আহমেদ জানান, জনবল সংকটই মূল সমস্যা। তবে বর্তমান সংসদ সদস্য বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সচিব বরাবর আবেদন করেছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, "আগে ৫০ শয্যার নামে শুধু ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল মিথ্যাচার। আমি মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে কথা বলেছি। দ্রুতই এই হাসপাতালকে পূর্ণাঙ্গ ৫০ শয্যায় উন্নীত করে জনবল পদায়ন করা হবে।"
রামগঞ্জের সাড়ে চার লাখ মানুষ এখন প্রতীক্ষায় আছে—কবে শেষ হবে এই দুই দশকের বঞ্চনা আর কবে মিলবে সুচিকিৎসার নিশ্চয়তা।