|| ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১৮ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
রামগঞ্জে ৫টি স্লুইস গেট দুই যুগ ধরে অকেজো: মালিকানা নিয়ে কর্তৃপক্ষের রশি টানাটানি, ভোগান্তিতে কৃষকরা
প্রকাশের তারিখঃ ৪ এপ্রিল, ২০২৬
মাসুদ রানা মনি, লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধি
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাঁচটি স্লুইস গেট দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং মালিকানা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর উদাসীনতায় এগুলো এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপে পরিণত হয়েছে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, গেটগুলো কোন বিভাগ নির্মাণ করেছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছে না খোদ উপজেলা প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
সরেজমিন চিত্র
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সরেজমিনে রামগঞ্জ-সোনাইমুড়ি বিরেন্দ্র খালের আনসার ভিডিপি ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকা, আলীপুর ব্রিজের পাশের স্লুইস গেট এবং কাঁটাখালী ও পানপাড়ার মজুপুর স্লুইস গেটগুলোতে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দশা। খালের ওপর কংক্রিট ও স্টিলের ফ্রেমের এই বিশালাকার কাঠামো এখন নিছক কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গেটগুলো অকার্যকর হওয়ায় খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। খালজুড়ে কচুরিপানা ও ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমে পানি কালো হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পলি জমে সরু হয়ে যাওয়ায় খালগুলো নাব্যতা হারিয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
কৃষকদের ভোগান্তি
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, স্লুইস গেটগুলো উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করছে। কৃষক আবুল মান্নান পাটোয়ারী জানান:
“সরকার চাষাবাদের সুবিধার জন্য এগুলো তৈরি করেছিল। কিন্তু সংস্কার না করায় এখন অসময়ে পানি আটকে থাকে, আবার খরা মৌসুমে সেচের পানি পাওয়া যায় না। অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ফসল তলিয়ে যায়।”
একই সুরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নোয়াগাঁও ইউনিয়নের আমির হোসেন ও ভাদুর ইউনিয়নের হাসানসহ আরও অনেক ভুক্তভোগী। তাদের দাবি, গেটগুলো হয় সংস্কার করে কার্যকর করা হোক, নাহয় দ্রুত অপসারণ করে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা হোক।
দায় নিতে নারাজ কর্তৃপক্ষ
তথ্যমতে, ২০০১-২০০২ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অর্থায়নে এই গেটগুলো নির্মিত হয়েছিল। তবে বর্তমানে এর দায়ভার কেউ নিতে চাচ্ছে না।
* বিএডিসি: রামগঞ্জ বিএডিসি অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, এই গেটগুলো তাদের বিভাগ থেকে করা হয়নি এবং এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
* পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো): রামগঞ্জ উপজেলা উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. সাকিল মাহমুদ জানান, গত বছরের বন্যার সময় গেটগুলোর বেহাল দশা নজরে এলেও এগুলো পাউবোর আওতায় নয়।
* উপজেলা কৃষি অফিস: উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাব্বির আহমেদ সিফাত জানান, গেটগুলো তাদের আওতাধীন নয়। তবে এগুলো অকেজো থাকায় সেচ সংকট ও জলাবদ্ধতায় ফসল উৎপাদনের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
* এলজিইডি: রামগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী সাজ্জাদ মাহমুদ খাঁন জানান, তার জানামতে কাঁটাখালিতে এলজিইডির একটি স্লুইস গেট আছে, যেটি সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে বাকিগুলোর ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন।
প্রশাসনের আশ্বাস
এ বিষয়ে রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারাশিদ বিন এনাম জানান, জনভোগান্তির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, “স্লুইস গেটগুলো কোন বিভাগ থেকে করা হয়েছে, সে বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দাপ্তরিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি সংস্কারে কৃষকের উপকার হয় তবে সংস্কার করা হবে, অন্যথায় অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
দীর্ঘ দুই দশক ধরে অযত্নে পড়ে থাকা এই স্লুইস গেটগুলোর ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী ঘটে, সেদিকেই তাকিয়ে আছে রামগঞ্জের কয়েক হাজার কৃষক।
Copyright © 2026 দৈনিক বাংলার অধিকার. All rights reserved.