|| ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ || ১৮ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি
শিক্ষিত চোর . আফতাবুল ইসলাম মেহেরাব
প্রকাশের তারিখঃ ৪ নভেম্বর, ২০২৫
শিক্ষিত চোর,
আফতাবুল ইসলাম মেহেরাব
আমরা বলি, শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় — আজ সেই শিক্ষাই অনেকের হাতে অন্ধকারের অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
আমাদের সমাজে হাজারো শিক্ষিত মানুষ আছে, যারা ডিগ্রিধারী, পদমর্যাদাসম্পন্ন, দায়িত্বশীল। কিন্তু এদের মধ্যেই আছে একদল মানুষ, যারা শিক্ষা, জ্ঞান ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রের সম্পদ লুট করছে। তাদের হাতেই দেশের উন্নয়ন থেমে যাচ্ছে, জনগণের বিশ্বাস ধ্বংস হচ্ছে, আর সৎ মানুষেরা বঞ্চিত হচ্ছে ন্যায্য প্রাপ্য থেকে।
শিক্ষিত চোর কারা?
চোর বলতে আমরা বুঝি — যে ব্যক্তি অন্ধকারে চুপিচুপি অন্যের সম্পদ নিয়ে যায়। কিন্তু শিক্ষিত চোর হলো সেই ব্যক্তি, যে আলোর মুখে বসে থেকে নৈতিকতার মুখোশ পরে দেশের সম্পদ চুষে খায়।
তারা হয়তো ডাক্তার, প্রকৌশলী, সচিব, ব্যাংকার, বা আইনজীবী — সমাজে “সম্মানিত” পেশাজীবী। কিন্তু ভিতরে তারা দুর্নীতির নেশায় আসক্ত। সরকারি অফিস, প্রকল্প, বাজেট, টেন্ডার—সবখানেই এদের থাবা। তাদের চারপাশে থাকে “দালাল সিন্ডিকেট” — যারা ঘুষ, কমিশন ও অবৈধ টেন্ডারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে।
যাদের সরকারি বেতন ১০,০০০ টাকা, তারা ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে মাসে ৫০,০০০–১ লাখ টাকাও কামায়! অথচ এই টাকাই সাধারণ মানুষের ঘামের ফসল — কর, ভ্যাট, বিল আর খেটে খাওয়া মানুষের রক্তের দাম।
কিছু বাস্তব উদাহরণ
চাঁদপুর জেলার হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে: দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তারা এক চিকিৎসককে হাতেনাতে ধরেন। সরকারি হাসপাতালের রোগীর কাছ থেকে তিনি ২০০ টাকা “ভিজিট ফি” নিচ্ছিলেন! সরকার যেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়ার কথা বলছে, সেখানে চিকিৎসক নিজেই রোগীর কষ্টকে অর্থে রূপ দিচ্ছে — এটি কি শিক্ষার ব্যবহার, নাকি অপব্যবহার? সরকারি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিয়ম: ১৮০ গ্রামের পরিবর্তে দেওয়া হয় ৮৮ গ্রামের মাছ, রুই মাছের জায়গায় দেওয়া হয় পাঙ্গাস। মানুষের খাদ্য, ওষুধ, নির্মাণ সামগ্রী—সব জায়গাতেই একই চিত্র। কম দিয়ে বেশি বিল তোলা এখন অনেকের “পেশা”।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক): দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার ১১ কার্তিক ১৪৩২ তারিখের প্রতিবেদনে উঠে আসে — “চসিকে মাত্র দুটি সংখ্যা ঘষে মুছে ৪০ কোটি টাকার পৌরকর ফাঁকি দেওয়া হয়!” ইছহাক ব্রাদার্স ও ইনকনট্রেন্ড ডিপো নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের কর নির্ধারণ ছিল প্রায় ৫১ কোটি টাকা, অথচ কাগজে ঘষেমুছে সেটি দেখানো হয় মাত্র ১১ কোটি! এভাবেই কয়েকটি সংখ্যা বদলে কোটি কোটি টাকা উধাও হয়ে যায় — যেন যাদু! কিন্তু আসলে এটি প্রশাসনিক প্রতারণা — এবং শিক্ষিত চোরদের শিল্পকলা।
নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র
এই শিক্ষিত চোরদের কারণে দেশের উন্নয়ন থমকে যায়, প্রকল্প অসম্পূর্ণ থাকে, রাস্তা তৈরি হয় বৃষ্টিতেই ধসে পড়ে, স্কুলের ভবন ভেঙে পড়ে শিশুদের উপর। তারা শুধু অর্থ লুটে নেয় না, মানুষের আস্থা, ন্যায়বোধ আর দেশপ্রেম—সবকিছু ধ্বংস করে দেয়।
আর এভাবেই আমরা তৈরি করছি এমন এক সমাজ, যেখানে সৎ মানুষ টিকে থাকতে পারে না, আর অসৎ মানুষ পুরস্কৃত হয় “চেয়ার”, “পদবী” আর “সম্মাননা” দিয়ে।
কেন তারা এমন হয়?
কারণ তারা শিক্ষা পেয়েছে, কিন্তু নৈতিকতা শেখেনি। তারা জানে কিভাবে নিয়ম ঘুরিয়ে নিজের সুবিধা নিতে হয়, কিন্তু জানে না কিভাবে অন্যের অধিকার রক্ষা করতে হয়। তাদের কাছে “দেশ” মানে শুধু নিজের সুবিধা — “মানুষ” মানে সুযোগ।
একজন অশিক্ষিত চোর হয়তো একটি ব্যাগ চুরি করে, কিন্তু একজন শিক্ষিত চোর এক সিগনেচারে কোটি কোটি টাকার সম্পদ আত্মসাৎ করে।
আমাদের করণীয়
আমাদের পরিবর্তন শুরু করতে হবে নিজের থেকেই —
ঘুষ না নেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিতে হবে,
অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে,
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবি তুলতে হবে।
দুর্নীতি কোনো একদিনে থামবে না, কিন্তু আমরা নীরব থাকলে তা কখনোই থামবে না।
শিক্ষা যদি মানুষকে সৎ না করে, তবে সেই শিক্ষা অন্ধকার। “শিক্ষিত চোর” হলো সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর রোগ — কারণ তারা জ্ঞানের মুখোশ পরে মানুষের বিশ্বাস হত্যা করে।
আজ সময় এসেছে এই শিক্ষিত চোরদের মুখোশ খুলে দেওয়ার, যেন সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষরা — সততা, ন্যায় ও মানবতার পাশে দাঁড়াতে পারে।
Copyright © 2026 দৈনিক বাংলার অধিকার. All rights reserved.