|| ১২ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৭শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ || ২৩শে রমজান, ১৪৪৭ হিজরি
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে রাউজানে পূজা মণ্ডপ পরিদর্শন: ধর্মীয় সম্প্রীতির উৎসবমুখর পরিবেশ
প্রকাশের তারিখঃ ৩ অক্টোবর, ২০২৫
যীশু সেন, বিশেষ প্রতিনিধি :
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে রাউজান উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদ ও দক্ষিণ উপ-কমিটির যৌথ আয়োজনে দক্ষিণ রাউজানের বিভিন্ন পূজা মণ্ডপ পরিদর্শন করা হয়েছে। ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ঐতিহ্যের এই আয়োজনে প্রশাসনের কর্মকর্তা, পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ সমাজের নানা শ্রেণিপেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।
পরিদর্শন কর্মসূচিটি স্থানীয় মণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসাহিত করা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পরিদর্শন কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করেন রাউজান উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিসান বিন মাজেদ এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) অং ছিং মারমা। তাঁরা বেশ কিছু মণ্ডপে গিয়ে পূজারীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং মণ্ডপ পরিচালনা কমিটির সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
ইউএনও জিসান বিন মাজেদ বলেন- "দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় আয়োজন নয়, এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে আমাদের ঐতিহ্যবাহী একটি উৎসব। রাউজানে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদযাপন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।"
সহকারী কমিশনার (ভূমি) অং ছিং মারমা বলেন- "সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে রাউজানে এক ধরনের সম্প্রীতির চিত্র আমরা দেখতে পাই। এই ধারা অব্যাহত রাখতে প্রশাসন এবং স্থানীয় জনসাধারণ একযোগে কাজ করছে।
এই পরিদর্শনে রাউজান প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি এবং রাউজান পূজা উদযাপন পরিষদের সহ-সভাপতি সাংবাদিক যীশু সেন, পূজা পরিষদের উপদেষ্টা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ডা. সুপণ বিশ্বাস শঙ্করেশ, দক্ষিণ উপ-কমিটির সভাপতি জে কে শর্ম্মা জনি ও সাধারণ সম্পাদক বিটু কান্তি দে, শিক্ষক বিজয় বিশ্বাস, অর্পণ মহাজন, প্রিন্স চৌধুরী শুভ, সোহেল দত্ত রাহুল, শিমুল দে, বাপ্পু বর্মন অভি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিক যীশু সেন বলেন - "রাউজানে দুর্গাপূজা ঘিরে যে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তা দেশের মধ্যে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদযাপন করতে পারা আমাদের সকলের সম্মিলিত সাফল্য।"
ডা. সুপণ বিশ্বাস শঙ্করেশ বলেন -"সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে ঐতিহ্য রাউজানে বহু বছর ধরে বজায় রয়েছে, এই ধরনের সমন্বিত কর্মসূচি তারই প্রমাণ। এখানে সব ধর্মের মানুষ একসাথে উৎসব উদযাপন করে।"
পরিদর্শন কর্মসূচির আওতায় দক্ষিণ রাউজানের উল্লেখযোগ্য পূজা মণ্ডপসমূহ ঘুরে দেখা হয়। মণ্ডপগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল: রাউজান আদ্যাপীঠ মন্দির, নববারদী কৈলাশ ধাম ও দুর্গা মন্দির, ঠাকুর চান মহাজন শ্রীশ্রী দুর্গা মন্দির, শ্রীশ্রী শিবা বাড়ী ও কালী বাড়ী দুর্গা মন্দির, দত্তপাড়া শ্রীশ্রী জালাকুমারী মাতৃ মন্দির ও দুর্গা মন্দির প্রমূখ।
প্রত্যেকটি মণ্ডপেই ছিল চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জা, মনোমুগ্ধকর প্রতিমা, ও সুশৃঙ্খল ভক্ত-সমাগম। মণ্ডপ পরিচালনা কমিটিগুলো স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট ছিলেন।
পরিদর্শন কর্মসূচিতে অংশ নেয়া সংগঠনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—বাংলাদেশ গীতা শিক্ষা কমিটি (বাগীশিক) কেন্দ্রীয় সংসদ, বাগীশিক রাউজান উপজেলা শাখা, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, সনাতনী বন্ধুমহল, এবং শুভম্ মিউজিক্যাল গ্রুপ। এসব সংগঠনের প্রতিনিধিরা পূজা মণ্ডপ পরিদর্শনে অংশগ্রহণ করে, স্থানীয় পূজার আয়োজকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থাপন করেন।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে রাউজানবাসীর মধ্যে। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ একত্র হয়ে পূজার শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং সামাজিক সৌহার্দ্যের এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
রাউজান পূজা উদযাপন পরিষদ দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক বিটু কান্তি দে বলেন, "ধর্ম যার যার, উৎসব সবার—এই মন্ত্রে বিশ্বাসী রাউজানবাসী। প্রতিটি মণ্ডপে আমরা দেখতে পেয়েছি সকল সম্প্রদায়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।"
রাউজান পূজা উদযাপন পরিষদের দক্ষিণের সভাপতি জে কে শর্মা জনি বলেন- “দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐক্যের প্রতীক। রাউজানে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়েছে, যা সত্যিই প্রশংসনীয়।”
দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সমাজের প্রাণের উৎসব হলেও এর আবেদন ছড়িয়ে পড়েছে সব ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণির মানুষের মধ্যে। রাউজান উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলে আয়োজিত এই পরিদর্শন কর্মসূচি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রশাসনের আন্তরিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সক্রিয়তা, এবং সাধারণ মানুষের ভালোবাসা মিলে এটি হয়ে উঠেছে এক উজ্জ্বল, সম্প্রীতির উৎসব।
এই ধরনের কর্মসূচি আয়োজনের মধ্য দিয়ে একটি বার্তাই স্পষ্ট হয়—ধর্মীয় অনুশাসন পালনের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা এবং সংস্কৃতি চর্চা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব।
Copyright © 2026 দৈনিক বাংলার অধিকার. All rights reserved.