চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে তরুণীর রহস্যজনক মৃত্যু নাকি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড-দৈনিক বাংলার অধিকার

0
35

সিদ্দিকুর রহমান নয়ন: দৈনিক বাংলার অধিকার:

শাহরাস্তিতে প্রবাসী তৌকির আহমেদ রনির স্ত্রী জান্নাতুন নাঈম সুখী’র রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। ঈদের আগেরদিন বিকেলে সংগঠিত এ ঘটনাকে ঘিরে নানা গালগল্প ও মুখরোচক কাহিনি ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ নিহতের পরিবারের।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, উপজেলার ওয়ারুক পাটওয়ারী বাড়ির মৃত ইউসুফ পাটোয়ারির ছেলে তৌকির আহমেদ রনি প্রায় ৩ বছর পূর্বে প্রেম করে বিয়ে করেন একই ইউনিয়নের রাড়া গ্রামের মশিউর রহমানের মেয়ে জান্নাতুন নাঈম সুখীকে। বিয়ের দেড় মাস পরেই জীবিকার তাগিদে সৌদি চলে যায় তৌকির। মেধাবী জান্নাত বিয়ের পরেও চাঁদপুর সরকারী কলেজে সমাজকর্ম বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। পড়ালেখার প্রতি তার আগ্রহ ও একাগ্রতা দেখে সকলেই তার ভূয়সী প্রশংসা করতো। পড়াশুনা, স্বামী ও পরিবার নিয়ে সুখে থাকা সুখীর জীবনে কি এমন ঘটনা ঘটেছিলো যাতে জীবনের সমাপ্তি টানতে হয়েছে- এ প্রশ্ন পরিবার, স্বজন ও সহপাঠিদের।

কি হয়েছিলো সেদিন?
১১ আগষ্ট রোজ রোববার বেলা সাড়ে ৫ টায় জান্নাতুন নাঈম সুখী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্নহত্যা করেন বলে দাবি করে নিহতের শ্বশুর বাড়ির লোকজন। তাদের মতে, বখাটের উৎপাতে নিজের জীবনকে বিসর্জন দেওয়াটাই শ্রেয় মনে করে আত্নহত্যার মতো জঘন্য পথ বেছে নিয়েছে সুখী। এ ঘটনায় প্রতিবেশি হাসানকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন সুখীর শ্বাশুড়ি পারুল বেগম। তবে এ নিয়ে এলাকাবাসীর মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া বিরাজ করছে।
শ্বাশুড়ি পারুল বেগমের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঈদের আগের দিন রোববার (১১ আগস্ট) দুপুর ১ ঘটিকায় আমি ও আমার জা আকলিমা হাজীগঞ্জ বাজারে ঈদের কেনাকাটা করতে যাই। পুত্রবধু জান্নাত উন্মুক্ত গোসলখানায় গোসল করতে যান। তখন প্রতিবেশি বখাটে ছেলে হাসান (২১) দেয়ালের ফাঁক দিয়ে জান্নাতের গোসলের দৃশ্য দেখে। পরবর্তীতে হাসান সুখীকে কুপ্রস্তাব দেয় বিধায় সুখী বিষয়টি তার প্রবাসী স্বামী রনিকে মুঠোফোনে জানায়। রনি খারাপ ভাষায় তাকে গালমন্দ করলে সুখী ফাঁসি দিয়ে আত্নহত্যা করে। আমার ছেলে ফোন দিয়ে সুখীকে না পেয়ে আমার জা আকলিমার নাম্বারে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করে আমরা কোথায় আছি? তাৎক্ষনিক সে আমাকে বাসায় কাউকে পাঠিয়ে দেখতে বলে বাসায় সুখীর কি হয়েছে? আমি আমার এলাকার সোহেল পাটোয়ারী (৩২) নামের ছেলেকে ফোন দিয়ে আমার বাসায় যেতে বলি। সে তার স্ত্রী আঁখি আক্তারকে (২২) আমার বাসায় পাঠালে আঁখি আমার পুত্রবধুর লাশ সিলিংয়ের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যান। পরবর্তীতে এলাকার মানুষজন ফাঁস অবস্থা থেকে নামিয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। আমি হাজীগঞ্জ হতে পথিমধ্যেই হাসপাতালে গিয়ে আমার পুত্রবধূকে মৃত দেখতে পাই।
শাহরাস্তি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোজাম্মেল জান্নাতের মৃতদেহ উদ্ধার করে। চাঁদপুর মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে গত সোমবার ঈদের দিন বাদ আসর জানাযা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

লাশ নামানো নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্যঃ
সুখী মৃত্যুর ঘটনা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা বলে ছড়ানো হলেও তার ঝুলন্ত লাশ কারা নামিয়ে হাসপাতাল নিয়েছিলো এ নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। স্বামী পরিবারের পক্ষ হতে প্রথম দিন জানানো হয়, কে বা কারা তাকে ফাঁস হতে নামিয়েছে তা তারাও জানেন না। শুক্রবার বিকেলে পুনরায় ওই বাড়িতে গেলে সুখীর শাশুড়ি পারুল বেগম জানান, তার জা’র মেয়ে সুরভী ঝুলন্ত দেহের উপরের উড়না কেটে সুখীকে নামায়। ঘটনার সময় উপস্থিত প্রতিবেশি সোহেল পাটোয়ারী (৩২) বলেন, ঘটনার দিন অভিযুক্ত হাসান সহ আমি ঈদগাহ পরিষ্কার করতে ছিলাম। হাসান পাটোয়ারী বাড়ীতে পানি খাওয়ার জন্য কলপাড়ে গিয়ে ফেরত আসেন এবং আমার সন্তানকে পানি আনার জন্য পুনরায় জগ নিয়ে পাঠায়। আমিসহ হাসান পানি খেয়ে আবার কাজে মনোযোগ দেই। কাজ শেষে তিনি বাড়ী চলে যান। কিন্তু হাসান ঈদগাহে অবস্থান করে আরও কিছু বন্ধুসহ। পরবর্তীতে বিকাল সাড়ে ৫ টায় সুখীর চাচী শাশুড়ী আকলিমা বেগম যখন তাকে ফোন দিয়ে তাদের বাসায় যেতে বলেন, তখন সে তার স্ত্রী আঁখি (২২) কে পাঠালে আখি সুখীর ঝুলন্ত লাশ দেখতে পায়। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি এসে সুখীকে ফ্লোরে শয়ন অবস্থায় পেলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই। আমি সহ তানভী ও ফাতেমা নামক আরও দুজন মহিলা আমার সাথে সিএনজি যোগে হাসপাতালে যান। পরবর্তীতে ভয় পেয়ে আমরা লাশ ফেলে চলে আসি।
পানি খাওয়ার সময় হাসানের কাছে সেই সময় কোনো মোবাইল ছিলো না বলে তিনি দাবি করেন। ভিডিও ক্লিপের যে ঘটনার কথা আমরা শুনেছি তা বানোয়াট।
কাছের হাসপাতালে দ্রত না নিয়ে দূরবর্তী হাসপাতালে কেন সুখীকে নিতে গেলেন? সোহেলকে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি এটির সদুত্তর দিতে পারেন নি।
সুখীর মা শাহনাজ পারভীন আক্ষেপ করে বলেন, আমার মেয়েটা দুনিয়া হতে চলে গেছে, অথচ তার মৃত্যুর সময়কালীন ঘটনাটা পর্যন্ত আমরা জানতে পারছি না। তার ঝুলন্ত লাশ বের করা কিংবা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার লোকগুলো কে?
নিহতের শ্বাশুরী ও চাচী শ্বাশুরী এ প্রতিবেদকের সাথে কথা বলার সময় বিভিন্ন লোকদের নিকট ফোন দিয়ে প্রতিবেদককে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেন ও বিষয়টি লুকাতে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকেন।

ভিকটিমের দেহে আঘাতঃ
ভিকটিম আত্মহত্যা করেছে বলে স্বামী পরিবারের পক্ষ হতে বলা হলেও তার ঠোঁটে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। একটা মেয়ে নিজে আত্মহত্যা করলে তার মুখে আঘাতের দাগ কোত্থেকে আসবে এমন প্রশ্ন করে ঘটনাস্থলে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে সুখীর সহপাঠিরা। এ প্রশ্নকে ঘিরে স্বজনদের অনেককে দাঁড়িয়ে অশ্রুপাত করতে দেখা যায়।

সুখীর বান্ধবিরা জানানঃ
সুখীর বান্ধবী শিখা জানান, সুখী মেয়েটি উন্মুক্তমনা ছিল। সব বিষয়ে সে সৃষ্টিশীল মানসিকতার অধিকারি ছিল। সব সময় সে আমাদেরকে কোন ঝামেলা হলে তা সমাধানের উপায় বুঝাতো। সেই মেয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করবে তা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।
সুখীর আরেকজন বান্ধবী নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, সুখীর ননদ ইতি আমাকে একটি মেসেজ দিয়েছে সুখী নাকি ধর্ষণ হয়েছে বিধায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্নহত্যা করেছে। সে প্রেম পরবর্তী সকল কিছুতেই পরিবার থেকে চাপ পেয়েও নিজে কখনো ভেঙ্গে পড়ে নি, বরং ধৈর্য নি